লন্ডনের প্রথম মুসলিম মেয়র সাদিক খানের সংক্ষিপ্ত জীবনী

প্রকাশিত: ৪:১৬ অপরাহ্ণ, মে ৭, ২০১৬

রুম্মান আহমদ,বিশেষ প্রতিনিধিঃ
লন্ডনের নতুন মেয়র পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত সাদিক খান সুযোগ-বঞ্চিত পরিবারের ছেলে। সাদিক খান তার বাপ-মায়ের আট সন্তানের একজন। পাকিস্তান থেকে আসা সাদিক খানের বাবা ছিলেন বাস ড্রাইভার এবং মা জীবিকা নির্বােহর জন্য সেলাইয়ের কাজ করতেন। তারা থাকতেন দক্ষিণ লন্ডনের একটি এলাকায় দরিদ্রদের জন্য তৈরি সরকারী কাউন্সিল ফ্ল্যাটে। ছোটবেলা থেকেই সাদিক খান নিজে যে আদর্শে বিশ্বাসী তা নিয়ে লড়তে এবং সাফল্যের জন্য সব প্রতিকূলতার মোকাবেলা করতে পিছপা হন নি। আর সেই আত্মবিশ্বাস ও জেদ তাকে যুক্তরাজ্যের অন্যতম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ এনে দিয়েছে। লন্ডনের মেয়র হিসাবে যে ক্ষমতার অধিকারী তিনি হচ্ছেন আগামী চার বছরের জন্য, তা তার জন্য বিরাট একটা আবেগের বিষয় বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন লন্ডনের সব অধিবাসীকে কোনো রকম বৈষম্য না করে সমান গুরুত্ব দিয়ে তিনি দেখতে চান- আর এটা প্রমাণ করার সুযোগ তিনি পেয়েছেন। লেবার পার্টির রাজনীতিকরা যখন মেয়র পদে দাঁড়ানোর জন্য তাদের নাম পেশ করেছিলেন,তখন লেবার পার্টির তালিকায় একেবারে পেছনের সারিতে ছিল সাদিক খানের নাম। সাদিক খানের বাবা আমানুল্লাহ খান এবং মা সেহেরুন খান পাকিস্তান থেকে লন্ডনে আসেন ১৯৭০ সালে – সাদিক খানের জন্মের কিছুদিন আগে। সাদিক খান তাদের আট ছেলেমেয়ের মধ্যে পঞ্চম। তারা সাত ভাই এবং এক বোন। সাদিক খান সব সময়েই বলেছেন শ্রমজগত সম্পর্কে প্রথম জীবনে তার যে ধ্যানধারণা ছিল সেটাই পরবর্তীতে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সম্পর্কে তার আদর্শে রূপ নেয়। তার বাবা যিনি ২৫ বছর লন্ডনে বাস চালিয়েছেন সাদিক খান বলেন”তিনি ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন ভাল বেতন ও কর্মপরিবেশ পেয়েছেন কিন্তুু মা বাসায় বসে সেলাইয়ের কাজ করতেন তিনি তা পান নি”দক্ষিণ পশ্চিম লন্ডনের যে তিন-কামরার ফ্ল্যাটে তারা থাকতেন, সেখানে তাদের বড় পরিবারকে গাদাগাদি করে থাকতে হতো। স্থানীয় একটি সরকারী স্কুলে তিনি পড়তেন এবং সেখানেই ১৫ বছর বয়সে তিনি রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং লেবার পার্টিতে যোগ দেন। আর্নেস্ট বেভিন কলেজ নামে ওই স্কুলের প্রধান ছিলেন যুক্তরাজ্যের কোনো মাধ্যমিক স্কুলের প্রথম মুসলমান প্রধান শিক্ষক। মিঃ খান ছোটবেলা থেকেই মুসলিম ধর্মবিশ্বাসকে লালন করেছেন এবং তিনি বলেছেন বাবা মা’র কাছ থেকে এই শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন যে ”কোথাও অন্যায় কিছু দেখলে তা পরিবর্তনের চেষ্টা করা তোমার কর্তব্য।” তিনি লেখাপড়ায় ভাল ছিলেন, ফুটবল, বক্সিং এবং ক্রিকেট অনুরাগী ছিলেন। এমনকী তরুণ হিসাবে তিনি সারে কাউন্টি ক্রিকেট দলেও কিছুদিন ট্রেনিং নিয়েছিলেন। তবে তিনি বলেছেন ফুটবল মাঠে কীভাবে তাকে ও তার ভাইকে বর্ণবাদী মন্তব্য শুনতে হয়েছে, যার কারণে তিনি ঘরে বসে খেলা দেখাই ”নিরাপদ” মনে করতেন। পরে তিনি লিভারপুল দলের ভক্ত হয়ে ওঠেন। প্রথমদিকে তিনি বিজ্ঞান নিয়ে পড়েছিলেন- ভেবেছিলেন দন্ত চিকিৎসক হবেন। পরে একজন শিক্ষকের পরামর্শে তিনি আইন পড়তে যান। ওই শিক্ষক তাকে বলেছিলেন”তুমি সবসময় তর্ক করো।” ১৯৯৪ সালে তিনি একটি আইন সংস্থায় মানবাধিকার আইনজীবী হিসাবে যোগ দেন। ওই বছরই তার স্ত্রী সাদিয়া আহমেদের সঙ্গে তার পরিচয় ও বিবাহ। সাদিয়াও আইন পড়তেন এবং কাকতালীয়ভাবে তিনিও বাসচালকের কন্যা। তাদের দুই কন্য সন্তান আছে আনিসা আর আম্মারা। সাদিক খান স্থানীয় প্রশাসনে ১২ বছর কাজ করেছেন। ২০০৪ সালে আইনজীবীর কাজ ছেড়ে তিনি পুরো সময়ের জন্য রাজনীতিতে যোগ দেন। ২০০৫ সালে তিনি দক্ষিণ লন্ডনের টুটিং এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। রাজনীতিতে বিভিন্ন দলে তার সমসাময়িকরা বলেছেন সাদিক খান”খুবই বুদ্ধিদীপ্ত”এবং”একগুঁয়ে” ব্যক্তি এবং”তার যুক্তি খারিজ করে দেয়া প্রায়ই কঠিন”। ২০১০ সালে গার্ডিয়ান পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সাদিক খান বলেছিলেন”আমি উদ্ধত কোনো মন্তব্য করতে চাই না-তবে ব্রিটিশ মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গুছিয়ে যুক্তি দিয়ে বক্তব্য তুলে ধরতে পারে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম, খুব কম মুসলমানকে বলতে শোনা যায় ‘আমি একইসঙ্গে ব্রিটিশ, মুসলমান এবং লন্ডনবাসী- তা নিয়ে আমি গর্বিত।” সূত্র- বিবিসি বাংলা