আর দেখা হবে না কামরান ভাই, আর কথা হবে না

প্রকাশিত: ৭:৩২ অপরাহ্ণ, জুন ১৬, ২০২০

মঈন উদ্দিন
২৮ মে। বিকাল ৫ টা ৫৮ মিনিট। কল করেছিলাম কামরান ভাইকে। রিং হলেও সাড়া পাইনি। কিছুটা হতাশ হই- এমনটি কখনো হয় না। ভাবলাম হয় ঘুমে নয়তো অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত আছেন বোধহয়। ভাবনার মাঝেই দেখি কল করেছেন কামরান ভাই। কুশল বিনিময় করলেন স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায়। কথার টানে বুঝতে পারছিলাম ব্যস্ত আছেন। শারীরিক অবস্থার খোঁজ করছিলাম। মাত্র ২৭ সেকেন্ডের কথোপকথন। এইটুকুতেই বুকটা মুচড়ে গেলো। অনেকটা ধরা গলায় বললেন, অনেক কিছু বলেছি। মাফ করে দিও। আর দেখা হবে কি- না জানিনা। এই কথা শোনার পর আর এগোতে পারিনি। সালাম দিয়ে রেখে দিলাম ফোন। মনটা ভারি হয়ে উঠলো, চোখও নয় কি? ভাবলাম কোমলপ্রাণ কামরান ভাইর মন খারাপ হয়ে আছে ভাবির (আসমা কামরান) জন্য। এজন্য ফোনে এমনভাবে বিদায় নিলেন। কিন্তু আমি কি জানতাম এটাই তার সাথে আমার শেষ কথা! গতকাল ভোরে যখন জানলাম বদর উদ্দিন আহমদ কামরান আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, খুব অসহায় বোধ করছি এর পর থেকে।

কতো স্মৃতি কামরান ভাইয়ের সাথে। সাধারণ একজন মানুষ থেকে অসাধারণ হয়ে উঠার গল্প ক’জনইবা লেখাতে পারে? কামরান পেরেছিলেন বলেই গণমানুষের হৃদয়ে জায়গা পেয়েছেন। ওয়ান-ইলেভেনের দুঃসহ স্মৃতি অনেকেই বয়ে বেড়াচ্ছেন। কামরান ভাইও কি সেটা করেননি। মনে আছে, যেদিন কামরান ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয় সেদিনের কথা। গভীর রাতে কামরান ভাইয়ের ফোন। অফিস (তখন শ্যামল সিলেটে কাজ করি) থেকে তড়িঘড়ি করে তার ছড়ারপারের বাসায় চলে আসি। মিডিয়ার অনেকেই আসেন। আমরা যারা সেখানে ছিলাম দেখেছি কামরান ভাইয়ের পেরেশানি। বাসার দু’তলায় একবার উঠেন তো আরেকবার নামেন। হাতে তসবিহ। আমাকে একবার কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, আমাকে না নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত তোমরা বাসায় থেকো। অপেক্ষা করতে করতে শেষ রাতের দিকে কামরান ভাইকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। দুঃসময়ে তিনি আমাদেরকে পাশে চেয়েছিলেন। তিনি হয়তো ধারণা করছিলেন খারাপ কোনো পরিণতির কথা।
যাহোক একসময় জনবান্ধব এই নেতার ঠাঁই হয় কুমিল্লা কারাগারে। সিটি নির্বাচনও ঘনিয়ে আসে। তিনি একটা বিশ্বস্ত হাত তালাশ করছিলেন। একদিন তার এক ঘনিষ্ঠজন এসে বললেন, কামরান ভাই আপনার উপর ভরসা করেন। জেল থেকে তিনি অনুরোধ করেছেন, আপনি যেনো তার জন্য একটা লিফলেট লিখে দেন। ওই সময়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় কাজটা দুঃসাহসেরই ছিলো। কামরান ভাইয়ের ওই ঘনিষ্ঠজন, আমি আর প্রেসের লোক ছাড়া এই লিফলেটের কথা কেউ জানতেও পারেনি। কয়েক হাজার লিফলেট ছাপানো হয়। পরে সেটা মানুষের হাতে হাত পৌঁছে যায়।
এ-তো একটি ঘটনা। পরেরটায় আমাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে। ওই নির্বাচনের সপ্তাহ/দশদিন আগে বিশেষ একটা সংস্থার কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় একগাদা কাগজ-পত্র। নির্দেশের সুরে বলা হয় এগুলো ছাপাতে হবে। পড়ে আমার শিরদাড়া খাড়া হয়ে গেলো। কামরান ভাই সম্পর্কে খারাপ অনেক কথা। হুমকি মাথায় নিয়ে অফিসে চলে আসি। মম ভাইয়ের (শ্যামল সিলেটের তৎকালীন সম্পাদক চৌধুরী মুমতাজ আহমদ) সাথে শেয়ার করি। তিনি অভয় দিয়ে বললেন আমরা ছাপাবো না। যা হবার হবে।
এর পরেরটাতো ইতিহাস। নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পান কামরান ভাই। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে অনেকেই অহংকারী হয়ে উঠেন। কামরান সেটা করেননি। দু’হাত উজাড় করে মানুষকে ভালোবাসা বিলিয়েছেন। বিনিময়ে পেয়েছেন মানুষেরা নিখাঁদ ভালোবাসা।
ওপারে ভালো থাকবেন কামরান ভাই।