বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়ংকর যত সিরিয়াল কিলার

প্রকাশিত: ৪:৫৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ২১, ২০২০

মোস্তাকিম ভুঞা::
সিনেমার গল্পের মতো হলেও সত্যি, একটা সময় বাংলাদেশে অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের ভয়ংকর রকম উৎপাত ছিল। দেশের ৬৩ টি জেলায় বোমা হামলা থেকে শুরু করে জঙ্গিবাদ ঘৃণ্য সকল অপরাদেরই ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশে। জানা যায়, একসময়ে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের প্রকাশ্য রাজত্বের বিষয়ে, খুন, সন্ত্রাস, রাহাজানি কিংবা সিরিয়াল কিলিং কি ছিল না! সিরিয়াল কিলার বা কিলিং পাশ্চাত্যের ধারণা হলেও বাংলাদেশে বেশ কয়েকজন সিরিয়াল কিলার সম্পর্কে জানা যায়। আজকের পর্বে চলুন জেনে নেই বাংলাদেশের ভয়ংকর কিছু সিরিয়াল কিলার সম্পর্কে।

এরশাদ শিকদার

কুখ্যাত এই খুনির জন্ম ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার মাদারঘোনা গ্রামে। তার পিতার নাম বন্দে আলী। অত্যাচার, চুরি-ডাকাতি ও নানা অপরাধের জন্য কুখ্যাত এই খুনি। ১৯৬৬-৬৭ সালের দিকে জন্মস্থান ছেড়ে খুলনায় আসে। রেলস্টেশনে কুলির সহকারী হিসেবে কাজ নেয়। কালক্রমে সে রেললাইনের পাত চুরি করে বিক্রি চক্রের সাথে জড়িয়ে পড়ে। এবং একসময় সে নিজেই নতুন দল গঠন করে ও রাঙ্গা চোরা নামে পরিচিতি পায়। আরও পরে রামদা বাহিনী গঠন করে ডাকাতি, রাহাজানি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের পর ’৮২ সালে ৪ ও ৫ নং ঘাট এলাকা দখল করে। সেইসাথে তার একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৯৯ সালের ১১ই আগস্ট গ্রেফতার হয় এই খুনি। গ্রেফতার কালে তার নামে ৪৩টি মামলা হয়েছিল। ৬০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগযুক্ত এই খুনি ১৮টি কেসে বেকসুর খালাস পেলেও ৭টি মামলায় তার ফাঁসির সাজা হয় এবং চারটিতে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় হয়। অতঃপর ২০০৪ সালে খুলনা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির মাধ্যমে অবসান ঘটে তার রাজত্বের।

বাবু শেখ

খুন করা যেন তাঁর নেশা। বেশির ভাগ খুনই তিনি করেছেন রাতের বেলায়, ঠান্ডা মাথায়। এভাবে ছয় বছরে ১০ টি খুন করেন। তাঁর শিকার হয়েছে ১ শিশু ও ৯ নারী। নিহতদের পাঁচজনকে হত্যার আগে ধর্ষণও করেন তিনি। আত্মস্বীকৃত এই ভয়ংকর খুনির নাম বাবু শেখ ওরফে আনোয়ার হোসেন ওরফে আনার ওরফে কালু। নওগাঁর রানীনগর উপজেলার হরিশপুর গ্রামের জাহের আলীর ছেলে বাবু শেখ। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই খুনি কিছুদিন আগে নাটোর জেলা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। এরপর পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে একে একে সব খুনের কথা স্বীকার করেন তিনি। এসব খুনের দায় স্বীকার করে সম্প্রতি কয়েক দফায় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন বাবু শেখ। এর মধ্যে কয়েকটি খুনের ঘটনায় অন্য লোকদের আসামি করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, একজন সাজাও খাটছেন।

রসু খাঁ

প্রেমে প্রতারিত হয়ে শপথ নিয়েছিল খুন করবে ১০১ জন নারীকে। কিন্তু ২০০৯ সালের ৭ই অক্টোবর ধরা পরার আগে তার সর্বশেষ শিকার ছিল এগারোতম। রশিদ খাঁ তথা রসু খাঁর জন্ম চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ থানার মদনা গ্রামে। পরিবারের সদস্যরা নানাদিকে আলাদা হয়ে গেলে ভবঘুরের বেশে টঙ্গী আসে রসু। বিয়ের পর সে জানতে পারে তার স্ত্রীর একটি চোখ নষ্ট। বছর দুয়েক পর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে শশুরবাড়ি রেখে শ্যালিকা রিনা বেগমকে বিয়ে করে। দ্বিতীয় স্ত্রী রিনা গার্মেন্টসে কাজ নেয়। এদিকে সে জড়িয়ে যায় অপরাধ কর্মকাণ্ডে। ফরিদগঞ্জ থানায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে ফরিদগঞ্জের ৬টি, হাইমচরের ৪টি ও চাঁদপুরের ১টি ঘটনার বর্ণনা দেয়। ৩টি থানার ১০টি অজ্ঞাতপরিচয় লাশের সাথে হুবহু মিলে যায়। তার খুনের পদ্ধতি প্রায় একই রকম ছিলো। শ্বাসরোধ করে পানিতে লাশ ফেলে দেয়া। প্রায় প্রতিটি শিকারের শরীরে কামড়ের দাগ। সেইসাথে ছুরি দিয়ে বক্ষদেশ ও গোপনাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তার শিকার ছিল ১৬-৩৫ বছর বয়স্ক নারী। একটি মামলায় তাকে ফাঁসি ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের রায় দেয়া হয়।

মাহফুজ

২০ বছর বয়সী যুবক মাত্র চার ঘণ্টায় খুন করে তার ৫ জন নিকটাত্মীয়কে। খুনের অস্ত্র হিসেবে শিলপাটার শিল বেছে নেয় সে। শিলের আঘাতে সবাইকে হত্যা করে অচেতন না করেই। তাৎক্ষণিকভাবে এই খুনের সিদ্ধান্ত সে নিয়েছিল। পুলিশ জানায়, খুনের পেছনে তার মনোবল প্রচণ্ড দৃঢ়। জানা যায়, প্রথম খুনটি করার পরেও না পালিয়ে একে একে দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ খুনগুলো করে। এরপর সে অপেক্ষা করতে থাকে। বাসায় ফিরে এলে অনুজ মামাতো ভাই শান্তকেও সে নিস্তার দেয় না। এরপর সে শিল ও কাপড় থেকে যথাসম্ভব রক্ত মুছে পোশাক পাল্টে ফেলে। সে যে হোসিয়ারিতে কাজ করত সেখানে গিয়ে গোসল করে ঘুমিয়ে পড়ে। খুনির ভাষ্যমতে তার ছোট মামী লামিয়ার সাথে তার প্রণয়ের সম্পর্ক ছিলো। তীব্র আক্রোশে সে হত্যাকান্ডগুলো ঘটায় বলে জানা যায়। পাঁচজনের হত্যাকান্ড সে একাই ঘটায়, এই বক্তব্যে পুলিশও হতবাক।