সুনামগঞ্জে কর্মহীন হয়ে ঘরে ফেরাদের মানবেতর জীবন

প্রকাশিত: ৩:৪৬ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১, ২০২০

চৌধুরী আহমদ মুজতবা রাজী::
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই আতঙ্কিত হয়ে বা উপায়হীন হয়ে অনেকেই কর্মস্থল থেকে ফিরে এসেছেন নিজ বাড়িতে। কেউ খালি হাতে, কেউ বা জমানো সামান্য সঞ্চয় নিয়ে। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অনেক পেশাজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। রিকশা ও সিএনজি অটোরিক্সা চালকেরও আয় রোজগার নেই। খাবারের জোগানের সাথে বড় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছিল বাড়ি ভাড়া। ঢাকা, সিলেট, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্রগ্রাম থেকে অগণিত মানুষ ফিরে এসেছেন নিজ বাড়িতে। বেকারত্ব আর বাড়িভাড়ার চাপের সাথে যোগ হয়েছিল পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতি টান। বাড়ি ফিরে আসা এমন অনেক লোকই আজ বেকার। হাওরাঞ্চলের কিছু লোক এসে ধান কেটেছেন, কিছু লোক মাছ ধরার কাজে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছেন। বড় শহর থেকে গ্রামীণ পটভূমিতে ফিরে অনেকেই তাল মেলাতে পারছেন না। তবুও নেই কোন উপায়। গ্রামে তো অন্তত মাথা গোজার ঠাঁই তো আছে। বৈশাখ মৌসুমে ধান কাটার কাজ করে ভাতের সংস্থান করতে পেরেছেন অনেকেই। করোনার এ সময়ে অন্তত ১০ হাজার মানুষ ফিরে এসেছেন গ্রামে।

আয় রোজগারহীন অবস্থায় কাটছে মানবেতর জীবন

ধর্মপাশা:
ধর্মপাশা উপজেলায় আনুমানিক দুই থেকে আড়াই হাজার লোক করোনাকালীন সময়ে বাড়িতে ফিরে এসেছেন। কর্মহীন এসব মানুষ আয় রোজগার না থাকায় রয়েছেন মানবেতর অবস্থায়। মাছ ধরা, মাটি কাটা এবং দিনমজুরির কাজ করছেন কেউ কেউ। তবে অনেকেই এসব কাজ করতে না পরে পুরো সময়টাই বেকার কাটাচ্ছেন। আয় রোজগারহীন অবস্থায় কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবন।
নারায়ণগঞ্জফেরত সোলেমান হোসেন বলেন, তিনি সেখানে সিএনজি চালাতেন। লকডাউন শুরু হলে সিএনজি চালনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাওয়া জোগাড় করাই কষ্টকর হয়ে পড়ে। সাথে যোগ হয় বাড়ি ভাড়া। আয় রোজগার না থাকায় স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে সব মালপত্র নিয়ে ফিরে এসেছেন নিজ বাড়িতে। ধান কাটার মৌসুমে ধান কাটার কাজ করে কিছু ধান সংগ্রহ করায় ভাতের সংস্থান কিছুটা করতে পেরেছেন। আয় রোজগার না থাকায় সামনে কী হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

ধান কাটার মৌসুমে কেউ কেউ ধান কেটেছেন

তাহিরপুর:
তাহিরপুরের বিভিন্ন গ্রামে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরফেরত মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গাড়ি চলাচল শুরু হওয়ার পরে আর হিসাব রাখা সম্ভব হয়নি। তারপরেও তাহিরপুরের বিভিন্ন গ্রামে বাড়ি ফেরত এসেছেন দুই হাজারের মতো লোক। তবে সংখ্যাটি আনুমানিক। অনেকেই এসেছেন আবার চলেও গেছেন। কর্মহীন হয়ে পড়া অনেকেই অনিশ্চয়তার কারণে বাড়িতে রয়ে গেছেন। ধান কাটার মৌসুমে কেউ কেউ ধান কেটেছেন, কেউ বা মাছ ধরার কাজে নেমে পড়েছেন। বালু পাথর সংগ্রহের কাজ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বন্ধ থাকায় আরো বিপদে পড়েছেন তারা।
ঢাকাফেরত শ্যামল জানান, তিনি ঢাকার উত্তরায় একটি গার্মেন্টসে লেবার হিসেবে কাজ করতেন। স্ত্রী ও ১ কন্যা নিয়ে ঢাকায় থাকতেন। কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক কষ্ট করে পরিবার পরিজন নিয়ে বাড়িতে চলে এসেছেন। তিনি নিশ্চিত নন কবে আবার ঢাকা যাবেন। আরেক গার্মেন্টসে এখন কাজ নেই। জমানো যে টাকা ছিল তা শেষের পথে। কি করবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

বাড়িতে অলস সময় কাটছে

দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আলী হোসেন জানান, এ ইউনিয়নে ১শ জনের মতো লোক ঢাকা ও গাজীপুর থেকে ফেরত এসেছেন। কর্মহীন হয়ে পড়া এসব মানুষ বাড়িতে অলস সময় কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ মাছ ধরায় নিজেদের নিয়োজিত করেছেন। তবে অধিকাংশ লোকই বেকার অবস্থায় আছেন।

আত্মীয়স্বজন আর সরকারি সাহায্যের উপর নির্ভরশীল

দোয়ারাবাজার:
কতজন গ্রামে ফিরেছেন তার পুরো হিসেব পাওয়া কষ্টকর। তবে প্রায় ৩শ লোক ফিরে এসেছেন গ্রামে। যারা বর্তমানে বেকার অবস্থায় আছেন। কর্মহীন হয়ে পড়া এসব মানুষ আত্মীয়স্বজন আর সরকারি সাহায্য এর উপর নির্ভরশীল হয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে জানা যায়, ৬ মার্চ থেকে ২২ মে পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসেবে মোট ৩ হাজার ৯২৫ জন লোক বিভিন্ন জেলা থেকে সুনামগঞ্জ জেলায় এসেছেন। পরবর্তীতে যান চলাচল সীমিত আকারে চালু হওয়ায় সে হিসেব আর রাখা হয়নি।