জামালগঞ্জে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আলোকিত হয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষিকা, সন্তান

প্রকাশিত: ১১:১৮ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৫, ২০২০

মোঃ ওয়ালী উল্লাহ সরকার, জামালগঞ্জ প্রতিনিধি:

সভ্যতার শুরু থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে চলেছে শিক্ষক শিক্ষাগুরু। শিক্ষার মধ্যে দিয়ে এককালের আদিম মানুষ তার আদিমতা থেকে মুক্তি পেয়েছে। আজকালকার দিনের সভ্যতার সে পদার্পন করতে পেরেছে। শিক্ষক মানুষের দ্বিতীয় জন্মদাতা। বাবা-মা সন্তানকে জন্ম দেন ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত মানুষ হিসাবে তার মানবিক দিক থেকে শুরু করে জীবন গঠনের সকল বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলেন একজন শিক্ষক। ফলে শিক্ষার্থী হয়ে উঠে শিক্ষকের মানস সন্তান। এজন্য শিক্ষককে বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর।

মানুষ জন্ম মাত্রই মানুষ নয়। সেও অপরাপর জীবের মত একটি প্রাণী মাত্র। শিক্ষকের যাদুর কাঠির প্রত্যাশিত স্পর্শে সে প্রাণী মানুষে পরিণত হয়। শিক্ষক এমন এক পরশপাথর সদৃশ্য যার স্পর্শে জন্মসূত্রে মানবাকৃতির প্রাণীটি বুদ্ধিদৃপ্ত মানুষে পরিণত হয়। কেননা শিক্ষক মানুষকে মনুষ্যত্ব লোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি মানুষ হিসাবে আমাদের করণীয় কাজগুলো কি হতে পারে তার পথ জানিয়ে দেন। তিনি সেখানে কি করে মানুষ হিসাবে নিজেকে গঠন করা যায়, কিভাবে জীবনকে স্বার্থক ও সুন্দর ভাবে উপভোগ করতে হয়, কিভাবে মনের মালিক হয়ে অনুভূতি ও কল্পনার রস আস্বাদন করা যায় তার পথ বাতলিয়ে দেন। শিক্ষকগণ শুধু প্রাণীত্বের বাঁধন থেকে মুক্তি দেন না। মনুষ্যত্বের উচ্চ শিখড়ে তিনি তাকে নিয়ে যান। শিক্ষকগণ মানুষের মনের আলো, পথের দীশা, জীবন যাপনের পদ্ধতির নির্দেশক, তিনি তার স্বীয় মেধা, শিক্ষা ও মননের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীকে গড়ে তুলেন অনুরূপ ভাবে। আর এজন্যই শিক্ষার্থীকে শিক্ষকের মানস সন্তান হিসাবে গণ্য করা হয়। শিক্ষকের বিদ্যা বুদ্ধি ছাত্রের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। তাই মনুষত্ব্যের এই অমীয় ফল ভোগকারী ব্যক্তি বা জাতীগত ভাবে মানুষ শিক্ষকের কাছে ঋণী। এজন্য প্রতিটি মানুষের কাছে শিক্ষক-শিক্ষিকা পূজনীয়। এমন দু’জন শিক্ষক শিক্ষিকাকে নিয়ে আমার আজকের লিখা। তারা শুধু দেশ সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিটি সন্তানকে মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে জীবনের সুখ দুঃখকে পিছনে ফেলে মানুষ গড়ার কাজে ব্যয় করেছেন। আর সৃষ্টিকর্তাও তাদের সন্তানদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি হলেন আমাদের শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক বিবেকানন্দ তালুকদার। তিনি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার রফিনগর ইউনিয়নে পুরন্দরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উনার পিতা ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ১৯৭৭ সালে জামালগঞ্জ (বর্তমানে সরকারি) মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। চাকুরীর সুবাদে স্বপরিবারে জামালগঞ্জ চলে আসেন। স্থায়ী ভাবে জামালগঞ্জ বসবাস করেন। ১৯৯৬ সালে একই বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন। ২০১০ সালে বিদ্যালয় থেকে অবসর নেন। পরবর্তীতে ঝুনু মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে সেখান থেকেও অবসরে চলে যান। উনার সহধর্মীনি আভা রানী তরফদার জামালগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে ধানুয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন অবস্থায় ২০১৫ সালে অবসরে চলে যান। উনাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে অমিতাপ পরাগ ২৮তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সফলতার সহিত উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে রাঙ্গামাটি জেলায় এডিসি (জেনারেল) এর দায়িত্ব পালন করছেন। তার স্ত্রী সঞ্চিতা কর্মকার খাগড়াছড়ি সদর উপজেলায় ইউএনও হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। একমাত্র মেয়ে আইভি মল্লিকা জুঁই ঢাকা স্যার সলিমুল্ল্যা মেডিকেল হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস এবং পাবলিক হেলথ থেকে এমএস করে বর্তমানে বারিন্দ মেডিকেল কলেজে লেকচারার হিসাবে কর্মরত আছেন। তার স্বামী অভিজিৎ ধাম ২৯তম বিসিএস-এ স্বাস্থ্য ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে নওগা জেলার মান্দা উপজেলায় মেডিকেল অফিসার হিসাবে কর্মরত আছেন। দ্বিতীয় ছেলে অনিন্দ অভি ৩৮তম বিসিএসে প্রকৌশলী (সড়ক ও জনপথ) মনোনীত হয়েছেন। সে জামালগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় এবং উপজেলার ফলাফলে শ্রেষ্ঠ। জামালগঞ্জ সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৮ম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি এবং এসএসসি-তে এ-প্লাস পেয়ে পাশ করে। পরবর্তীতে ময়মনসিংহের সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজে এইচ,এস,সি’তে গোল্ডেন এ-প্লাসসহ বোর্ড স্কলার্সশীপ পায়। রাজশাহী প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ¯œাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ৩৮তম বিসিএসে প্রকৌশলীতে ৬ষ্ঠ স্থান পেয়ে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়।

অনিন্দ অভি বলেন, মা-বাবার ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণায় সৃষ্টিকর্তা আমাকে স্বপ্নচূড়ার স্পর্শ করেছেন। বিসিএস এ আমার স্বপ্ন ছিল, এই স্বপ্ন আজ আমার পূরণ হয়েছে। এই প্রাপ্তির সবটুকু আমার মা-বাবার প্রতি উৎসর্গ করতে চাই। আমি দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করতে চাই। অসামান্য পরিশ্রমে এমন ফলাফল পেয়ে আমার খুবই ভাল লাগছে। এই অর্জন নিজের এবং পরিবারের অনেক কষ্টের ফসল। তার মাতা আভা রানী তরফদার জানান, সব সময়ই স্বপ্ন দেখতাম অন্যান্য ছেলে-মেয়েদের সাথে নিজের ছেলে-মেয়েদেরও সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে। সৃষ্টিকর্তা আমাদের সেই স্বপ্ন সফল করেছেন। একটা ইচ্ছা ছিল সন্তানদের মানব সেবায় নিয়োজিত করা। আমি জানতাম মায়ের দোয়া কখনও বৃথা যায় না। সৃষ্টিকর্তা সহ সকলের কাছে আমার সন্তানদের জন্য আশীর্বাদ প্রার্থী। তারা যেন মানবসেবার মাধ্যমে আমাদের মুখ উজ্জল করে। অনিন্দ অভি’র বাবা বিবেকানন্দ তালুকদার জানান, দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর এ প্রাপ্তি আমাদের পরিবারের জন্য অনেক বড় অর্জন। প্রতিটি সন্তানের এমন অর্জন আমাদের পরিবারের আনন্দকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি সকলের নিকট আশীর্বাদ প্রার্থী। আমার প্রতিটি সন্তানদের যে আদর্শে গড়ে তুলেছি, তারা যেন সে আদর্শ ধরে রেখে মানব কল্যাণে নিয়োজিত থাকে।