অনার্জিত রয়ে গেছে স্বপ্নপূরণ

প্রকাশিত: ৬:৪১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২, ২০২০

কালনী ভিউ ডেস্ক::
শোকের মাস আগস্ট। এই মাসেই জাতি হারিয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্বাধীন দেশের মাটিতে ষড়যন্ত্রকারীদের নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছেন বঙ্গবন্ধু সপরিবারে। শোকের মাসে বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে জাতির পিতা ও অন্যান্য শহীদদের। এ উপলক্ষে বাংলা ইনসাইডারের নিয়মিত আয়োজনে আজ থাকলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি লেখার কিছু অংশ –

তখন আমি আজিমপুর স্কুলের ছাত্রী। ক্লাস নাইনে পড়ি।সমাজবিদ্যা একটা বিষয় ছিল আর ছিল পৌরনীতি।পরীক্ষায় একবার পৌরনীতিতে পাশের চাইতে এক নম্বর কম পেলাম।আমাদের গৃহশিক্ষক পি,কে,সাহা প্রত্যেক পরীক্ষার পর স্কুলের খাতাগুলো দেখতেন,পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন।আমি খুব মেধাবী ছাত্রী না হলেও একেবারে ফেল করার মতো অবস্থা ছিল না।বিশেষ করে পৌরনীতিতে ফেল করব,এটা সত্যিই অকল্পনীয় ছিল।মোটামুটি মাঝারি ধরনের ছাত্রী ছিলাম।একটু পড়াশোনা মন দিয়ে করলে ভালোই করতাম।কিন্তু বাসায় রাজনীতি চর্চা।সরকারি হয়রানি।আব্বাকে নানা ঝামেলায় থাকতে হতো।ঠিক পড়াশোনা চর্চা করার মতো পরিবেশই তেমন ছিল না।রাজনীতির খবরা-খবরের দিকে মনটা পড়ে থাকত বলে আরও অবহেলা হতো।কিন্তু আমার গৃহ শিক্ষক অত্যন্ত কড়া ও উপযুক্ত ছিলেন এবং খুবই যত্ন নিয়ে পড়াতেন।কাজেই উনি খুবই বিস্মিত হলেন যখন দেখলেন একটা বিষয় খারাপ করেছি।আর তাই তিনি স্কুলে গিয়ে হেডমাস্টারের অনুমতি নিয়ে খাতা দেখলেন।আমি ভয়ে অস্থির,কি ব্যাপার,কি হবে,আব্বা শুনলে তো মেরেই ফেলবেন।যদিও বকাবকি করবার সময়ও পেতেন না,তবুও ভয়।তার উপর মাকে তো আমরা আরও ভয় পেতাম।মার হাতে দুই-চার ঘা যে খেতে হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।কি অন্যায় করে ফেললাম,কে জানে।ভূগোল.ইতিহাসে মোটামুটি ভালো নম্বর।ভূগোলে প্রথম বিভাগের নম্বর থাকতো।কিন্তু পৌরনীতির অবস্থা শোচনীয়।খাওয়া-দাওয়া বন্ধ প্রায়।স্যার খাতায় কী দেখে আসেন,কী ভুল করলাম।স্যার এলেন এবং এসেই খুব হাসতে থাকলেন।খাতায় লেখা আছে,‘এই মেয়ে বড় বড় নেতাদের বক্তৃতা অনুসরণ করে,বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না।’

যে প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমার উপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে,তা হলো আইয়ুব খান সংক্রান্ত।তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি মিলিটারি ডিক্টেটর আইয়ুব খানের ক্ষমতার কথা লিখতে গিয়ে বইতে যেসব প্রশংসাসূচক কথা লেখা ছিল,সেগুলো আমি লিখিনি। বরং একদিন আলোচনা প্রসঙ্গে আব্বা কিছু কথা বলেছিলেন,সেই কথাগুলোই আমি লিখে দিয়ে এসেছি।আমি সেই সঙ্গে তার বক্তৃতায় যে সমস্ত কথা ছিল,তাও উল্লেখ করি এবং যথারীতি সেটাই হলো কাল।তাই খাতাসহ নম্বর বাতিল। অবশ্য দুঃখ নেই,আমি ঘটনাটি আব্বাকে বলি এবং বই নিয়ে আব্বার কাছে যাই।আব্বাকে বইগুলো দেখাই। সমাজবিদ্যা নামে আরেকটি বিষয় ছিল,যেখানে `পাকিস্তান`চ্যাপ্টার ছিল,যাতে নম্বর ছিল কুড়ি। আব্বা সবগুলো দেখলেন,অনেকক্ষণ আলাপ হলো এবং উনি বলে দিলেন পাকিস্তান চ্যাপ্টার পড়তে হবে না।এখানে অজস্র মিথ্যা কথা লেখা আছে, কাজেই মিথ্যা কথা শেখার প্রয়োজন নেই। আমিতো ভীষন খুশি। আমার সেই বইটা নেই।১৯৭১ সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী যখন বাড়ি লুট করে তখন জিনিসপত্র হারিয়ে যায়।নইলে সেই বইগুলো থাকতো,থাকতো সেই সমাজবিদ্যা বইটিও।

আব্বা সেদিন যে কথাগুলো বলেছিলেন,সে কথাগুলো আমি লিখে নিয়েছিলাম।এরপর সিদ্ধান্ত নেই আর পাকিস্তান সম্পর্কে ঐসব ছাইপাশ পড়রো না বা এ-বিষয়ে লিখবো না।পড়ার অংশ থেকে বাদ পড়ে সেই `পাকিস্তান`চ্যাপ্টার।এমনকি ম্যাট্রিক পরীক্ষায়ও ঐ কুড়ি নম্বর বাদ রেখেই, প্রায় রিস্ক নিয়েই পরীক্ষা দেই এবং পাশ করতে তেমন কোন আসুবিধাই হয়নি।আব্বা আমাদের একটা কথা সব সময়ই বলতেন,রাজনীতি হলো দেশের মানুষের জন্য কিছু করা।এখানে ব্যক্তিগত লাভ লোকসান বড় কথা নয়।নীতি ও আদর্শই হল মূল্যবান। আইয়ুব খা ছিল সামরিক জান্তা।সব সময় জান্তার শাসনের বিরুদ্ধে একটা জন্মগত বিদ্বেষ জন্মে গিয়েছিল।যে কারণে পরবর্তীকালে জান্তার শাসনকে কখনোই মেনে নিতে পারিনি।১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর আমার আব্বা যদি ইচ্ছে করতেন ইয়াহিয়ার অধীনে প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন।আর আমরা পিণ্ডি থেকে পি-আই-এ’র বিমানে এসে ঢাকায় পা দিতে পারতাম।হয়তো একদিন এই মাটির মানুষগুলিকে দেখতাম করুণার চোখে।কিন্তু আমার আব্বা কখনও যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় যাবার রাজনীতি করেননি,বারবার চেয়েছেন এদেশের মানুষের অধিকার। ছোট্ট বেলা থেকেই গ্রামের দরিদ্র মানুষের প্রতি ছিল তার মমত্ববোধ। সব সময় বলতেন আমি বড় হলে এই দরিদ্র মানুষের দুঃখ ঘোচাবো।তিনি সব সময় নিজের টাকা পয়সা দুহাতে বিলিয়ে দিতেন। নিজের আরাম-আয়েশ হারাম করেছিলেন দেশের মানুষের জন্য। গ্রামের পরিবেশে ছোটবেলা মানুষ হয়েছেন,দেখেছেন গ্রামে মানুষের দারিদ্রতা, দুঃখ-কষ্ট, এসব তাকে খুবই পীড়া দিত। তাই পাকিস্তানি আধা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন। তাদের শোষণ কখনও মেনে নেননি।

নি চেয়েছিলেন বিনা রক্তপাতে রাজনৈতিকভাবে বাংলার মানুষকে স্বাধীনতা অর্জন করিয়ে দেবেন এবং অর্থনৈতিক মুক্তি আনবেন। সেই লক্ষ্যে তিনি ছয় দফা দিয়েছিলেন। এই ছয় দফাই পরবর্তীকালে এক দফায় রূপান্তরিত হয়। আমার মনে আছে ১৯৭১ এর মার্চ মাসে আমরা যখন এক সঙ্গে খেতে বসতাম, কথা প্রসঙ্গে ছয় দফার কথা উঠত। হাতের ছয়টি আঙুল তুলে পাঁচটি নামিয়ে ফেলতাম, একটি থাকত। এটা আমাদের সবারই অভ্যাস ছিল, শুধু মুখে উচ্চারণ করা বারণ ছিল। অবশ্য এই ইশারাই যথেষ্ট ছিল যে আমরা আসলে কি চাই।

১৯৬১ সাল হবে। চট্টগ্রামে বেড়াতে গিয়েছি। ওখানে আওয়ামী লীগের নেতা আজিজ সাহেব আব্বার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। চট্টগ্রামে সেবার আমাদের প্রথম যাত্রা। তাই খুব ঘুরে বেড়িয়েছি। আজিজ কাকার ছেলে মঞ্জু (বর্তমানে জাসদ নেতা) ও মেয়ে বিলকিস, আমি ও কামাল, আমাদের খুব বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। আমরা খুব বেড়াতাম, পাহাড় বেয়ে উঠতাম। আমরা সমতল ভূমির মানুষ, জীবনে প্রথম পাহাড় দেখছি। পাহাড়ের উচ্চতা তাই আমাদের অবাক করে দিত। এছাড়া ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম। মাস্টারদার বিপ্লবের কাহিনী ছড়িয়ে আছে। যদিও পাকিস্তান আমলে সে সব বই নিষিদ্ধ ছিল তবুও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন বা প্রীতিলতা ওয়াদ্দার কল্পনাসহ সব কাহিনী খুবই আগ্রহ নিয়ে পড়তাম। তাই কোর্ট বিল্ডিং, জালালাবাদ পাহাড়, চট্টগ্রাম ক্লাব সব ঘুরে ঘুরে দেখছি। কোর্ট বিল্ডিং থেকে রাতের সমুদ্রের অপূর্ব রূপও একদিন দেখলাম।

আমরা যেদিন টাইগার পাস দেখতে গেলাম, সেদিন আজিজ কাকা একটা কথা বললেন। টাইগার পাস তখন এত জনবহুল ছিল না, তখনও বেশ গাছপালা ছিল শহর থেকে বেশ দূরেই। আজিজ কাকা বললেন, “দেখো মা একদিন এখান থেকেই আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হবে। আর প্রথম ঘোষণা হবে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে।” আমাদের তিনি সেদিন কালুরঘাটও নিয়ে গেলেন। তখন খুব ফাঁকা জায়গা। কেবল একটা বিল্ডিং হয়েছে, রেডিও অফিস তখনও শহরে। দুঃখজনক হলো আজিজ কাকা স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি। ১৯৬৯ সালে হঠাৎ হার্টফেল করে মারা যান। তাঁর সঙ্গী ছিলেন হান্নান সাহেব, জহুর চৌধুরী, মানিক চৌধুরী। আজ আর কেউই বেঁচে নেই। তাঁর দূরদর্শিতা বা পরিকল্পনা যে দশ বছর পর এভাবে বাস্তবে পরিণত হবে, তা তখন ভাবতেও পারিনি। কিন্তু একটা কথা আব্বার কাছ থেকে বুঝে নিয়েছিলাম, পাকিস্তান নামের দেশ থেকে আমরা একদিন মুক্তি পাবই। সেই লক্ষ্য স্থির রেখেই তিনি কাজ করে গেছেন, সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, এই বাঙালি জাতির রাজনৈতিক স্বাধীনতা তিনি দিয়ে গেছেন। কিন্তু যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন এদেশের মানুষকে দুঃখ-দরিদ্রতা থেকে মুক্তি দেবেন এবং সেই লক্ষ্য স্থির করে পা-ও বাড়িয়েছিলেন, কিন্তু তা সমাপ্ত করতে পারেননি। স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁকে হত্যা করল। এই হত্যার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার চেতনাকেই হত্যা করে দিল। আজ আমাদের জন্য স্বাধীনতা শব্দটাই শুধু আছে। অনার্জিত রয়ে গেছে আব্বার স্বপ্নপূরণ।

রচনাকাল : ১৪ আগস্ট ১৯৯১