জজ মিয়া

গ্রেনেড হামলা: সেই জজ মিয়া

প্রকাশিত: ৪:৫১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২১, ২০২০

কালনী ভিউ ডেস্ক:
প্রকাশ্যে জনসভায় গ্রেনেড হামলা করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট। সেই গ্রেনেড হামলার পর গ্রামের সহজ-সরল এই যুবককে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করে গ্রেনেড হামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিল তৎকালীন জামায়াত-জোট সরকার। জজ মিয়া নামের সেই যুবক বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে চাপের মুখে বাধ্য হয়ে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা নিয়ে আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

ঘটনার কয়েক মাস পর তাকে নোয়াখালীর সেনবাগের গ্রামের বাড়ি থেকে আটক করে ২০০৫ সালের ৯ জুন ঢাকায় নিয়ে আসেন এই মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আবদুর রশিদ।

ঘটনার ১৬ বছর পরে এসেও সেই দিনের কথা মনে হলে আঁতকে উঠেন জজ মিয়া। গ্রেনেড হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সবাই বিভিন্নভাবে সরকারি সহায়তা পেলেও, আশ্বাসের পর নিজে কিছুই না পাওয়ার আক্ষেপও রয়েছে তার। তিনি বলেন, আমি হয়তো সরাসরি হামলায় আহত হইনি, কিন্তু এ ঘটনায় ভিন্নভাবে বিশাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।

এখন তিনি নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক হিসেবে কর্মরত। সামান্য বেতনে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অর্থকষ্টের মধ্যেই ওই এলাকায় বসবাস করছেন। কেমন আছেন এ প্রসঙ্গে বলেন, সামান্য ড্রাইভারির বেতন দিয়ে কোনোভাবে দিন চলে যাচ্ছে। গ্রেনেড হামলার ক্ষতিগ্রস্তরা সরকারি সহায়তা পেলেও আমি কোনো সহায়তা পাইনি। বিভিন্ন সময় আশ্বাস দেওয়া হলেও আমাকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। অথচ আমি নিজেকে হুমকির মুখে রেখে সত্য ঘটনা উদঘাটনে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছি। এখনো আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাই-যোগ করেন তিনি।

জজ মিয়ার বয়ান সূত্রে জানা যায়, তাকে আটক করার ছয় দিন পর ঢাকার আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। ২১ দিন রিমান্ডসহ মোট ২৭ দিন সিআইডি কার্যালয়ে তদন্ত কর্মকর্তার কক্ষে রাখা হয়। তার জন্য নতুন লেপ-তোশক ও বালিশ কেনা হয়। ভালো খাবার দেওয়া হয়। ২৭ দিন ধরে তাকে মূলত ভয় দেখানো ও সাজানো জবানবন্দি মুখস্থ করানো হয়। কয়েক দিন পরপর পরীক্ষা নেওয়া হতো, জবানবন্দি ঠিকভাবে মুখস্থ হয়েছে কি না। এরপর আদালতে নিয়ে সেই জবানবন্দি দেওয়ানো হয়। এরপর জজ মিয়াকে কারাগারে পাঠিয়ে তার পরিবারকে মাসে মাসে খরচের টাকা দিতেন তদন্তে যুক্ত সিআইডির তৎকালীন কর্মকর্তারা।

পরবর্তীতে ফাঁস হয়ে যায় সেই কাহিনী। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পক্ষ থেকে গ্রেনেড হামলার মূল ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার বিষয়টি ধরা পড়ে যায়। তবে এর মধ্যে বিনা অপরাধেই পাঁচ বছর কারাভোগ করতে হয়েছিল তাকে।

২১ আগস্টের ভয়াবহ স্মৃতি হাতড়ে জজ মিয়া বলেন, ওই দিন আমি বাড়িতে বাবুলের চায়ের দোকানে ছিলাম টেলিভিশনে দেখে এলাকার লোকজনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলি। সেখানে গ্রামের মুরব্বিরা সবাই ছিলেন। কিন্তু সেই আমাকেই কি না বানানো হয় গ্রেনেড হামলাকারী! ২১ আগস্টের সাত-আট মাস পর আমাকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রামের চৌকিদার বাড়িতে এসে বলেন, তোমার নামে থানায় মামলা আছে। এরপর সেনবাগ থানার কবির দারোগা এসে আমাকে হ্যান্ডকাফ লাগান। থানায় নেওয়ার পর কবির দারোগা বলেন, তোমার নামে এখানে কোনো মামলা নেই। ঢাকা থেকে সিআইডির এসপি রশিদ সাব আসতেছেন। ঢাকায় তোমার নামে বড় মামলা আছে। সেনবাগ থানায় এসপি রশীদ সাব ক্রসফায়ারে মারার ভয় দেখিয়ে বলেন, যা শিখিয়ে দিব সেগুলো কোর্টে বলতে হবে। তিনি আমাকে থানার মধ্যে ব্যাপক মারধর করেন। একপর্যায়ে বলেন, আমাদের কথা না শুনলে তোরে ক্রসফায়ারে দেবো। আর কথা শুনলে তোরে বাঁচাইয়া আনবো। তোর ফ্যামিলিকে প্রতিমাসে নগদ আড়াই হাজার টাকা দেবো।

জজ মিয়া আরও বলেন, এরপর আমাকে নোয়াখালীর সেনবাগ থানা থেকে ঢাকায় নিয়ে আসে। ক্রসফায়ারে মারার ভয় দেখিয়ে তারা যা শিখিয়ে দেন সেগুলো কোর্টে বলতে বলেন। আমি সেভাবেই বলি।

এদিকে, ঘটনার প্রায় ১৪ বছর পর হলেও প্রকৃত দোষীদের শাস্তির রায়ে সন্তুষ্ট জজ মিয়া। তবে উচ্চ আদালতে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। সেদিন বিকেলে ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশে একটি ট্রাকে তৈরি করা অস্থায়ী মঞ্চে দলের প্রধান এবং তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা বক্তৃতা শেষ করার পরই গ্রেনেড হামলা হয়। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েক শত নেতাকর্মী।