কালনী ভিউ

আক্রান্ত ইউএনও: বন্ধ হবে মাঠ প্রশাসনে কর্তৃত্বের লড়াই?

প্রকাশিত: ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২০

কালনী ভিউ ডেস্ক::
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের ইউএনও (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) ওয়াহিদা খানমের আক্রান্তের ঘটনার মধ্য দিয়ে মাঠ প্রশাসনের অনেক অসঙ্গতি এবং টানাপোড়েন সামনে চলে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরেই যে ঘটনাগুলো নিয়ে নানারকম আলোচনা ছিল এবং যে ঘটনাগুলো প্রতিকারের জন্য কথাবার্তা বলা হচ্ছিল সেই ঘটনাগুলো এখন নতুন করে সামনে এসেছে। ওয়াহিদা আক্রান্ত কেন হয়েছেন এবং কি কারণে তাকে নির্মমভাবে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে, তা তদন্তের বিষয় এবং তদন্তে নিশ্চয়ই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। তবে বাংলাদেশ এডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস এসোসিয়েশনের (বিএএসএ)-এর পক্ষ থেকে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, চুরির উদ্দেশ্যে নয়, বরং হত্যার উদ্দেশ্যেই ইউএনও’র উপর হামলা হয়েছে।

ঐ ঘটনার পর বাংলাদেশ এডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এসোসিয়েশনের সভাপতি ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলাল উদ্দিন এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছেন যে, ঘোড়াঘাটে বালু ভরাটের কাজ নিয়ে এক ধরণের অসঙ্গতি ছিল এবং একটি মহল এ নিয়ে তার উপরে রুষ্ট থাকতে পারে। সে কারণে এই ঘটনা ঘটতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেছেন।

যে ঘটনাই হোক না কেন, ওয়াহিদার উপর আক্রমণের ঘটনাটি যে চুরির ঘটনা না তা নিয়ে কোন মহলেরই সংশয় নেই। কিন্তু এই ঘটনাটি যদি চুরির ঘটনা না হয় তাহলে অবশ্যই এটা উদ্বেগের এবং আতঙ্কের। মাঠ প্রশাসনের এ ধরণের কর্তৃত্বের জন্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে হেনস্থা করা, চড়াও হওয়া, তাকে ঘেরাও করা কিংবা তার সঙ্গে প্রকাশ্য বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। কিন্তু এই ঘটনাগুলোকে নজরে এনে এর প্রতিকারের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা গ্রহণের কাজটি এতদিন হয়ে আসছিল না। অনেকে মনে করছেন এই ঘটনার কারণে এখন মাঠ প্রশাসনে শৃঙ্খলা এবং সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ উপজেলা পদ্ধতি চালু করেছিলেন এবং ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে উপজেলা পদ্ধতি বাতিল করেন। কিন্তু উপজেলা পদ্ধতির অনেকগুলো উপকারিতা ছিল। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে আদালত চলে যাওয়ার ফলে মানুষ অনেক উপকৃত হয়েছে। কথায় কথায় জেলায় আসার যে ঝক্কি-ঝামেলা ছিল সেটাও বন্ধ হয়েছিল। আর এ কারণেই আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে উপজেলা পদ্ধতি পুনরায় চালু করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো যে, উপজেলা পদ্ধতি পুনরায় চালু হলেও এখানে একটি দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা রয়ে গেছে। একদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, যার হাতে নির্বাহী ক্ষমতা। তিনি একটি উপজেলার মূলত অভিভাবক। আবার অন্যদিকে উপজেলা চেয়ারম্যান, যিনি একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। অথচ তার ক্ষমতা বলতে তেমন কিছুই নেই। একমাত্র স্থানীয় এমপির পরামর্শে তিনি উপজেলার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে পরামর্শ দিতে পারেন বা সুপারিশ করতে পারেন। আর উপজেলা চেয়ারম্যানদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তাদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব অর্পণের কথা বলা হচ্ছিল। আর এই দায়িত্ব না থাকার কারণে তারা বিভিন্ন কাজ যেমন, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, ত্রাণ বিতরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারদের দ্বারস্থ হন। অনেক জায়গায় তাদের সম্পর্ক ভালো এবং দুজনের সমন্বয়ের মাধ্যমে তারা উপজেলার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। কিন্তু অনেক জায়গাতেই উপজেলা চেয়ারম্যান (যেহেতু তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উপরে কর্তৃত্ব আরোপ করতে চান। অনেক সময় কোন কোন ক্ষেত্রে উপজেলা চেয়ারম্যান তার নিজস্ব লোকজনকে কাজ দেওয়া, জমি দেওয়া, বালু ভরাট, খাস জমি দখল ইত্যাদি নানা বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে তদবির করেন। এ ধরণের ঘটনা গত ১ বছরে কম হয়নি, যেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে উপজেলা চেয়ারম্যানের প্রকাশ্য বিরোধ তৈরি হয়েছে। শুধু উপজেলা চেয়ারম্যান নয়, অনেক সময় উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার সাথেও বিভিন্ন টেন্ডার, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। অনেক সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বদলি করার জন্য ডিও লেটার দেন এমপিরা। এরকম ডিও লেটারের সংখ্যা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে কম নয়। আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে একদিকে উপজেলা চেয়ারম্যানের লোকজনের তদবির-চাপ, অন্যদিকে স্থানীয় এমপির লোকজনের তদবির-চাপ ইত্যাদি সবকিছু সামাল দিয়ে এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং তৃণমূলের প্রশাসনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। আর এখানে প্রায়ই তাকে নানারকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীণ হতে হয়। এ বিষয়ে একটি সুষ্ঠ সমন্বয়ের কথা দীর্ঘদিন ধরেই বলা হচ্ছিল। কিন্তু এখন ইউএনও’র এই ঘটনার পর এটা স্পষ্ট হলো যে, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ইউএনও’র মধ্যে কাজের সমন্বয় থাকা উচিত। মাঠ প্রশাসন যেন স্বাধীনভাবে, নির্বিঘ্নে এবং নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন সেটারও ব্যবস্থা করা দরকার।

এই একটি ঘটনার পর প্রশাসনের সকলে আশা করেন যে, মাঠ প্রশাসনের কর্তৃত্বের লড়াই বন্ধ হবে এবং কোথাও কোথাও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের যে এক ধরণের হুমকি আর আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে কাজ করতে হয় সেই ধারারও বিলুপ্তি ঘটবে। প্রশাসন এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ের মাধ্যমেই একটি এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্ভব। কিন্তু তারা যদি পরস্পর মুখোমুখি অবস্থানে যান তাহলে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। বেশকিছু এলাকাতেই ঘোড়াঘাটের মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে মনে করেন প্রশাসনের অনেকে।