শিলং আর নাইট তীরে ‘বিদ্ধ’ সুনামগঞ্জ

প্রকাশিত: ৭:৩১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০১৭

কালনী ভিউ ডেস্কঃ
শিলংয়ের তীরে ‘বিদ্ধ’ হচ্ছে সুনামগঞ্জ। এতে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। রাতারাতি টাকাওয়ালা হওয়ার আশায় অনেকে দিনের পর দিন টাকা ঢালছেন জুয়ার বোর্ডে। এই খেলার নাম হচ্ছে ‘শিলং তীর’। এবার কেবল শিলং তীরই নয়, দেশীয় ‘নাইট তীর’ নামেও অনলাইনভিত্তিক জুয়া শুরু হয়েছে। যারা শিলং তীর খেলছেন তারাই আবার দেশীয় নাইট তীর খেলায় অংশ নিয়ে দ্বিগুণহারে ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন। শুধু সুনামগঞ্জ শহর নয় জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় এই জুয়ার নেটওয়ার্ক দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেটের পাশেই ভারতের খাসিয়া অধ্যুষিত মেঘালয় রাজ্য। এই রাজ্যের রাজধানী হচ্ছে শিলং। অনেক আগে থেকে শিলং তীর নামে একটি জুয়া খেলা মেঘালয়ে প্রচলিত রয়েছে। পরবর্তীতে খেলাটি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে আসে গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলায়। এই দুই থানা হয়ে পরে সেটি চলে আসে সিলেটে। পরবর্তীতে সুনামগঞ্জেও এর নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়। সুনামগঞ্জ শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, নতুন বাসস্ট্যান্ড, আরপিননগর, উত্তর আরপিননগর, লম্বা হাটি, সাহেব বাড়ি ঘাট, তেঘরিয়া, চান্দিঘাট, মাছ বাজার, সুরমা মার্কেট, হাসন নগর, বড়পাড়া, নতুন কোর্ট পয়েন্ট, ময়নার পয়েন্ট, আমবাড়ি, ইব্রাহিমপুর এলাকাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে ‘ওপেন সিক্রেট’ভাবে চলে এই তীর খেলা। স্থানীয় কয়েকজন এজেন্ট ভারতের এজেন্টদের সঙ্গে এই জুয়ার আসরের সমন্বয় করে। স্থানীয় এজেন্টরা আবার নিয়োগ করেন ‘ম্যানেজার’। খেলায় অংশ নেয়ার জন্য এই ম্যানেজারদের কাছেই নাম ও মোবাইল নাম্বার নিবন্ধন করেন সাধারণ মানুষ।। জানা গেছে, এদেশের এজেন্টদের মাধ্যমে ০-৯৯ পর্যন্ত নাম্বার বিক্রয় করা হয় যেকোনো মূল্যে। লটারিতে ০ থেকে ৯৯ পর্যন্ত যেকোনো সংখ্যা কিনে নেয়া যায়। সর্বনিম্ন ১০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাজি ধরা যায়। যত মূল্যে সংখ্যাটি বিক্রয় হবে তার ৭০ গুণ লাভ দেয়া হবে বিজয়ী নম্বরকে। অর্থাৎ ১০ টাকায় ৭০০ টাকা। একই নম্বর একাধিক লোকও কিনতে পারেন। সবাই কেনা দামের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি টাকা পাবেন। প্রতিদিন বিকেল সোয়া ৪টায় ও সাড়ে ৫টায় দু’বার এ লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হয়। খেলার ফলাফল দেয়া হয় অনলাইনে। ভারতের শিলং থেকে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জুয়ার আসরটি পরিচালনা করা হয়। এছাড়া দেশীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নাইট তীর নামেও খেলা শুরু হয়েছে। আলাদা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দেশীয় তীর সিন্ডিকেটরা এ খেলা পরিচালনা করে বলে জানাগেছে। রাত সাড়ে ১০টা ও রাত সাড়ে ১১টায় এই তীর খেলার ফলাফল ওয়েবসাইটে দেয়া হয়। শিলং তীরের মতো নাইট তীরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে দেশের কোন জায়গা থেকে নাইট তীর পরিচালনা করা হয় তার কোনো খোঁজ মিলেনি। এদিকে, বয়স্ক থেকে শুরু করে কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এই তীর শিলংয়ের নেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। নিম্ন আয়ের শ্রেণির লোকেরাই বেশি পা দিচ্ছেন এই জুয়া খেলায়। বিশেষ করে দিনমজুর, রিকসাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এমনকি গৃহিণীরাও জড়িয়ে পড়ছেন এই জুয়ায়।
সম্প্রতি শহরতলির ইব্রাহিমপুরে গিয়ে দেখা যায়, কিছু যুবক খাতা কলম ও স্মার্টফোন নিয়ে বসে আছে মাঠের মধ্যে। দূর থেকে মনে হবে তারা পড়াশোনাই করছে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখাগেল নাম্বার আর নাম্বার ভর্তি একটি খাতা। তাদের কাছে অনেকেই ‘টাকা লাগিয়েছেন’। এই চিত্র শুধু ইব্রাহিমপুরের নয়। বিভিন্ন পয়েন্টে লোকাল এজেন্টদের ‘ম্যানেজার’রা একই কাজ করে থাকে।
সুধীজনদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, জুয়া মারাত্মক নেশা। যা মানুষকে বিপদের দিকে ঠেলে দেয়। মানুষ জুয়ায় হেরে নিঃস্ব হয়ে যায়। ইতোমধ্যে শিলং তীর জুয়ার কথা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে। এটি অচিরেই বন্ধ করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার তাপস রঞ্জন ঘোষ বলেন, তীর-শিলং খেলাটা একরকম জুয়া। তরুণরা বিশেষ করে অনলাইনের সুবিধা নিয়ে এ খেলায় জড়িয়ে পড়ছে। এসব খেলায় যারা উদ্বুদ্ধ করছে বা এ খেলার এজেন্টদের বিরুদ্ধে লাগাতার অভিযান পরিচালনা করছি। ইতিমধ্যে আমরা ৯ জনকে আটক করে তাদেরকে সাজা প্রদান পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে গেছি। পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকায় এখন এর মূলহোতারা অনেকেই পালিয়েছে। আমরা তরুণদেরকে এ আসক্তি থেকে ফিরিয়ে আনতে আইনের পাশাপাশি অভিভাবক মহলেও সচেতনতা বৃদ্ধির আহবান। সুনামকন্ঠ