,

১১ বছরে ১৩ বিলাসবহুল বাড়ির মালিক সাংসদ রতন

কালনী ভিউ ডেস্ক::
সুনামগঞ্জ-১ আসনের টানা তিনবারের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন তার ১১ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের তিনটি জেলায় ১৩টি বিলাসবহুল বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন বলে দুদকে প্রাপ্ত অভিযোগ মতে জানা যায়।দেশ ধরে চলমান শুদ্ধি অভিযানে শুরু হওয়ার থেকেই আলোচনায় আসেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী এ সাংসদ। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এছাড়াও ক্যাসিনো-কাণ্ডে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তার বিরুদ্ধে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।১৯৭৩ সালে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার নওদা গ্রামে কৃষক আবদুর রশিদের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন সুনামগঞ্জের-১ আসনের সরকারদলীয় এ সাংসদ। ১৯৮৮ সালে ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথমে ফেল করে দ্বিতীয়বার পাস করেন রতন। পরে সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। যদিও জাতীয় সংসদের ওয়েবসাইটে ‘বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার’ লেখা রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জান যায়, সিলেট পলিটেকনিকে পড়ার সময় সিলেটের সাবেক এমপির বাড়ির ছাদের স্টোররুমে থাকতেন রতন। সে সময় তিনি ওই এমপির একটি ফোন-ফ্যাক্সের দোকান তদারকি করতেন। সিলেটের জগন্নাথপুর উপজেলায় টেলিফোন বিভাগে তার কর্মজীবন শুরু। ওই সময় তিনি জনৈক সিভিল সার্জনের স্ত্রী বিলকিস নূরের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা নিয়ে জগন্নাথপুরে আলাদা সার্ভার বসিয়ে অ্যান্টনাবিহীন ফোনের মাধ্যমে ভিওআইপি ব্যবসা শুরু করে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন। পাওনা নিয়ে বিলকিস নূর তার বিরুদ্ধে এনআই অ্যাক্টে মামলাও করেছেন।রাজনীতিতে খুব একটা যুক্ত না থাকলেও বিপুল অর্থ ব্যয়ে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান তিনি। সেবার সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে জয়ী হন মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালে হওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরপর আরও দুবার এমপি হন তিনি।এদিকে দুদকে প্রাপ্ত অভিযোগে মতে, রতন রাজধানী ঢাকা, সুনামগঞ্জ, ধর্মপাশা, নেত্রকোনা ও মোহনগঞ্জে ১৩টি বাড়ির মালিক। এর মধ্যে ধর্মপাশায় নিজ গ্রামে ১০ কোটি টাকায় ‘হাওর বিলাস’ নামে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন। বাড়িটি অধিকাংশ জমি জনৈক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যক্তির কাছ থেকে দখল করা। সুনামগঞ্জ শহরের মল্লিকপুরে জেলা পুলিশ লাইনসের বিপরীতে ৭ কোটি টাকায় বাড়ি কেনেন রতন। যার নাম দেওয়া হয়েছে পায়েল পিউ। বাড়িটি এক লন্ডনপ্রবাসীর কাছ থেকে কিনে নেন তিনি। এছাড়াও ধর্মপাশা উপজেলা সদরে তার আরও সাতটি বাড়ি রয়েছে। মোহনগঞ্জ উপজেলা সদরেও রয়েছে দুটি বাড়ি। নেত্রকোনা জেলা শহরেও একটি বাড়ি রয়েছে। নেত্রকোনা শহরে তার মা-বাবার নামে মেডিকেল কলেজ করার জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে জমি ক্রয় করেছেন তিনি। অন্যদিকে ঢাকার গুলশানের নিকেতনের কয়েকটি ফ্ল্যাটের মালিক রতন।অভিযোগ মতে, গত কয়েক বছরে তার সহোদর যতন মিয়ার নামে ৫০০ একর জমি কেনা হয়েছে। ওই জমিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্টের এজন্য একটি বিদেশি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তি করে প্রকল্প তৈরি করেন তিনি। কিন্তু তার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। ওই কোম্পানির সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও মোটা অঙ্কের পাওনা নিয়ে দেনদরবার চলছে। তাছাড়া রতনের নিজ নামেও আছে কমপক্ষে ৬০ একর জমি।কিন্তু নির্বাচন কমিশনে নিজের স্বাক্ষর করা হলফনামায় তিনি ২০০৮ সালের ২১ নভেম্বর লেখেন, তার স্ত্রী মাহমুদা হোসেন লতা ৪০ তোলা স্বর্ণের মালিক। রয়েছে ৩৫ লাখ ২৩ হাজার ৭৫৪ টাকার জমি। তবে স্ত্রীর কোনো আয় নেই। নিজের মোট আয় ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৩ টাকা। মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৮০ লাখ ৭৮ হাজার ৩২২ টাকা।২০১৩ সালের ৭ নভেম্বর দেওয়া হলফনামায় নিজ নামে সম্পদ বৃদ্ধির পাশাপাশি স্ত্রী লতার পরিচয় দেওয়া হয় ব্যবসায়ী। হলফনামায় স্ত্রী লতাকে পায়েল টেক্স লিমিটেডের পরিচালক বলা হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেওয়া হলফনামায় তিনি ৫২৩ দশমিক ২৭ একর কৃষিজমি, ৮ দশমিক ২৬ একর পরিমাণের অকৃষি জমি, একটি অ্যাপার্টমেন্ট এবং নিজের ও অংশীদারিত্বের তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকার কথা উল্লেখ করেন।এছাড়া একাদশ নির্বাচনের আগে রতনের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে স্থানীয় ২১ জন নেতা সুনামগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দাবি করেন। রতন নিজের মনোনয়ন ঠিক রাখতে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় রতন তার নামে-বেনামে থাকা রাজধানী ঢাকা, আশুলিয়া, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু জমি পানির দরে বিক্রি করেন।এদিকে অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে সাংসদ রতন বলেন, ‘অভিযোগ তো যার বিরুদ্ধে যা খুশি আসতেই পারে। আমি এসব নিয়ে কথা বলা বাদ দিয়েছি। আমি যেহেতু জীবিত আছি; আমার আয়কর বিবরণীতে সব তথ্য দেওয়া আছে, তাই আমি এসবের কোনো জবাব দিচ্ছি না।’ ক্যাসিনো-সংশ্লিষ্টতায় নিজের নাম আসা প্রসঙ্গে রতন বলেন, ‘ক্যাসিনো কী? আমার চৌদ্দগুষ্টির কেউ ক্যাসিনোর সামনে দিয়ে হেঁটেছে কি না সন্দেহ আছে।’রতনের অনুসন্ধানের বিষয়ে জানতে চাইলে কমিশনের উপপরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বলেন, তার বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য আসছে। যদিও তার সব আমলে নেওয়া সম্ভব হয় না।’অনুসন্ধান দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, আমরা রতনের ১৩টি বাড়ি, ৫টি গাড়ি, দুই স্ত্রীর নামে বিপুল সম্পদ ও দেশ-বিদেশে নামে-বেনামে সম্পদের তথ্য পেয়েছি। তার সম্পদের বিষয়ে জানার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেওয়া হবে। তার ব্যাংক হিসাব তলব করা হবে। এছাড়া তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই ক্যাটাগরীর আরো খবর