,

সুনামগঞ্জে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি : দশ মাসে ৪১ খুন, ৮১ ধর্ষণ

কালনী ভিউ ডেস্ক ::
জানুয়ারি থেকে অক্টোবর, চলতি বছরের এই দশ মাসে জেলায় ৪১টি খুন ও ৮১টি ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে নৃশংস কায়দায় তুহিনসহ তিন শিশু খুনের ঘটনা দেশব্যাপী আলোচিত হয়েছে। অনেকগুলো শিশু ধর্ষণের লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে এই সময়ে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ভ্যানচালক নিহত হওয়ার আলোচিত ঘটনা সংঘটিত হয়েছে চলতি বছরে।
গত বছর জেলায় সর্বমোট ৩৪টি খুন ও ৫৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল। চলতি বছরের ১০ মাসেই এই সংখ্যা পার হয়ে গেছে। ১০ মাসে গত এক বছরের তুলায় ধর্ষণের ঘটনা ২৮টি বেশি সংঘটিত হয়েছে।
এ অবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো তৎপর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। সেইসাথে শিক্ষার হার বাড়ানো, বেকারত্ব কমানো, কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের জনপ্রতিনিধিদের আরো বেশি সোচ্চার হওয়ার প্রয়োজন বলে মত তাদের।
জানা যায়, হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ জেলাকে দেশের অন্যতম শান্তিপ্রিয় জেলা হিসেবে মানা হলেও দিন দিন হত্যা, খুনের মতো গুরুতর অপরাধ বেড়েই চলছে। রাজনৈতিক সংঘাত, জমিজমা নিয়ে বিরোধ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা বেড়ে চলছে প্রতি বছর। সেইসাথে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে স্বজনকে ‘বলি’ দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে মানুষের মাঝে। সব মিলিয়ে গত ১০ মাসে জেলায় বেশকিছু আলোচিত খুনের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানায়, ১৫ মে ছাতকে নৌপথে চাঁদাবাজি নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় সাহাবুদ্দিন (৪৫) নামের একজন ভ্যানচালক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এছাড়াও গুলিতে ছাতক থানার ওসি ও চার পুলিশসহ আহত হন অর্ধশতাধিক।
১৮ অক্টোবর জগন্নাথপুর বাস স্টেশনে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুপক্ষের সংঘর্ষের সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে প্রাণ হারায় এক মাদ্রাসা ছাত্র। ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কোন আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় উদ্বেগে রয়েছেন স্বজনরা। মাদ্রাসা পড়ুয়া ওই শিশুর বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার নগরকান্দি গ্রামে। সে জগন্নাথপুর উপজেলার নোয়াগাঁও হাফিজিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত।

এদিকে, ১৩ অক্টোবর রাতে দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের কেজাউড়া গ্রামে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে স্বজনদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারায় সাড়ে ৫ বছর বয়সী শিশু তুহিন মিয়া। এই ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে তুহিনের এক চাচা ও চাচাতো ভাই। এই ঘটনায় তুহিনের পিতার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে দাবি পুলিশের। নির্মম এই খুনের ঘটনা সকল প্রকার পৈশাচিকতাকে হার মানিয়েছে। ঘাতকরা শিশু তুহিনের লাশ রাস্তার পাশের একটি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখে। এছাড়া তুহিনের পেটে দুটি ছুরি ঢুকিয়ে দেয় এবং দুটি কান, এমনকি যৌনাঙ্গটিও কেটে ফেলে। পৈশাচিক এই খুনের ঘটনায় সারাদেশে সমালোচনার ঝড় উঠে। খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে সারাদেশে প্রতিবাদ হয়।
১১ মার্চ রাতে ২৩ দিন বয়সী এক শিশুকন্যাকে বালতির পানিতে চুবিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠে স্বজনদের বিরুদ্ধে। ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ সৈদেরগাঁও ইউনিয়নের চাকলপাড়া গ্রামে এই নৃশংস ঘটনাটি সংঘটিত হয়।
এদিকে, গত ১০ মাসে ধর্ষণের ঘটনা বিগত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ১০ মাসে জেলায় ৮১টি ধর্ষণের ঘটনার অভিযোগ রেকর্ড করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ৫ বছর বয়সী শিশুকন্যাসহ পৌঢ়ও রয়েছেন।
সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট চাঁন মিয়া বলেন, খুন, ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ কমিয়ে আনতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোও প্রয়োজন। অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে সাধারণ মানুষের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করতে প্রেরণা যোগাতে হবে। ছোটখাটো বিবাদগুলো মিমাংসা করতে স্থানীয় সরকার বিভাগের জনপ্রতিনিধিদের আরো বেশি তৎপর হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে খুনোখুনির ঘটনা বেশি সংঘটিত হয়। এটা কমিয়ে আনতে ভূমি ব্যবস্থাপনার আমূল সংস্কার করা প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, অতীতে সংঘটিত অপরাধ কর্মকাণ্ডগুলো নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তি প্রদান করলে আইন হাতে নেওয়ার প্রবণতাও কমে যাবে। অপরাধ কমাতে শিক্ষার হার বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। সেইসাথে বেকারত্ব দূরীকরণে সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরো বেশি সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দেন এই আইনজীবী।
এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, এই বিষয় নিয়ে ভালভাবে বুঝে, পরিসংখ্যান দেখে তারপর মন্তব্য করা যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই ক্যাটাগরীর আরো খবর