তোফায়েল আহমেদ: নিজ ঘরে পরবাসী

প্রকাশিত: ৬:৫৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০২০

কালনী ভিউ ডেস্ক::
আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতা তোফায়েল আহমেদের আজ ৭৮ তম জন্মদিন। তোফায়েল আহমেদ সাবেক মন্ত্রী ছিলেন, কিংবা ভোলার এমপি তার চেয়ে বড় পরিচয়, তিনি আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদ। আওয়ামী লীগ এবং তোফায়েল আহমেদ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছেন। আরও বেশি করে বললে, তোফায়েল আহমেদ বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর। এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে তরুণদেরকে বিকশিত করার সুযোগ দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদের নাম সবার আগে আসবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রায় সার্বক্ষণিক সহচর ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। ৭৫এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যার আগ পর্যন্ত তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব এবং অনেক নীতিনির্ধারণী গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখতেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে বিশ্বাস করতেন ভালোবাসতেন। কিন্তু এরপর পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদ যেন নিজ ঘরে পরবাসী । তিনি আওয়ামী লীগে আছেন কিন্তু তার পরেও তিনি সেই আগের রূপে অবস্থানে বা মর্যাদায় নেই। তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে রাজনীতিতে যেমন বিতর্ক আছে, তেমনি তিনি তার মূল আদর্শ জায়গা থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। আওয়ামী লীগ ৭৫ পরবর্তী সময়ে নানা টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে গেছে। দল ভেঙেছে, অনেকে দলের ষড়যন্ত্র করেছে, তোফায়েল আহমেদ এই ভাঙা-গড়ার খেলায় কি ভূমিকা পালন করেছিলেন সেটি অন্য বিতর্ক । কিন্তু তিনি কখনো আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাননি। আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে তিনি স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। ৭৫ পরবর্তী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পর তোফায়েল আহমেদ যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পেরেছিলেন কিনা তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক আছে।

এ নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেই পক্ষ-বিপক্ষ আছে। অনেকে মনে করেন যে, তোফায়েল আহমেদের আসলে সে সময় কিছু করনীয় ছিল না। ৭৫ এর ঘাতকরা তোফায়েল আহমেদকেও টার্গেট করেছিল এবং ৭৫ পরবর্তী সময়ে তিনি নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। আবার অন্যপক্ষ মনে করেন, তোফায়েল আহমেদ চাইলে অনেক কিছুই করতে পারতেন, বিশেষ করে রক্ষীবাহিনী নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তার যা যা করা দরকার ছিল তার কিছুই তিনি করতে পারেনি । এই বিতর্কে দোলাচলেই তোফায়েল আহমেদ ৭৫ পরবর্তী তে আর রাজনৈতিক ভাবে বিকশিত হতে পারেনি। যদিও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে অন্যতম ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা হিসেবে তিনি এখনও তার রাজনৈতিক অতীত সমুজ্জ্বল। এখনো তিনি আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতাদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে তিনি কতটুকু গ্রহণযোগ্য, কতটুকু বিশ্বস্থ, কতটুকু আস্থাভাজন সে নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে।

৭৫ পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায় ১৯৯৬ সালে। এবং সে সময়ে তোফায়েল আহমেদ বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ পরাজিত হবার পর বিএনপি-জামাত জোটের আকর্ষিক শিকার যারা হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন অন্যতম। কিন্তু ২০০৭ সালে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে , বিশেষ করে সংস্কার প্রস্তাব দেয়া কতটা সঙ্গত ছিল তা নিয়ে অনেক রকম কথা আছে। কিন্তু তোফায়েল আহমেদ তাঁর ঘনিষ্ঠদের বলেছেন, তিনি একটা পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিলেন এবং যে পরিস্থিতির কারণে সেটি তাকে করতে হয়েছিল। কিন্তু রাজনীতিতে সাহস, ত্যাগ এবং দুর্যোগের সময় রুখে দাঁড়ানোর যে বৈশিষ্ট্য সে বৈশিষ্ট্যের ঘাটতি তোফায়েল আহমেদের আছে কিনা সে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

৭৫ এর ১৫ই আগস্ট যেমন তিনি তার নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেনি, ঠিক তেমনি ২০০৭ সালেও তার কাছ থেকে দলের নেতাকর্মীরা যে ভূমিকা প্রত্যাশা করেছিলেন তা তিনি দিতে পারেননি। সংকটের সময় জ্বলে উঠতে না পারার কারণেই আওয়ামী লীগে তোফায়েল আহমেদ এখন অতটা আপ্যায়িত নন এবং অতটা সমাদৃত নন। তিনি জনপ্রিয় নেতা, কিন্তু তিনি তার দলের মূল নেতৃত্বের প্রতি কতটা আস্থাশীল, মুল নেতৃত্বের প্রতি কতটা অনুগত সে বিতর্ক থাকতেই পারে। আওয়ামী লীগ থেকে দুবার মন্ত্রী করেছে, বহুবার তিনি এমপি হয়েছেন। আওয়ামী লীগ আর তিনি এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছেন, কিন্তু তারপরও তিনি আওয়ামী লীগের অধিকাংশ কর্মীদের কাছে আস্থাভাজন, বিশ্বস্থ নন। কর্মীরা তার জনপ্রিয়তাকে সম্মান করেন, তার অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা কে শ্রদ্ধা করে। কিন্তু তোফায়েল আহমেদ আসলেই নেতৃত্বের প্রতি কতটা আস্থাশীল, দু:সময়ে তিনি দলের মুল নেতৃত্বের পাশে কতটা দাঁড়াতে পারে, সে বিতর্ক আমৃত্যু তাকে বয়ে বেড়াতে হবে। এবং এটাই হলো তোফায়েল আহমেদের জীবন হয়তো সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।