ভ্যাক্সিন উদ্ভাবনের দৌড়ে বাংলাদেশ কোথায়?

প্রকাশিত: ১:০০ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৬, ২০২১

জিয়াউদ্দিন খন্দকার::

হাজারো উৎকণ্ঠা শেষে বিশ্বব্যাপি আশার আলো জাগিয়েছে কোভিড ভ্যাকসিন। ভ্যাক্সিন উদ্ভাবনের দৌড়ে ইতোমধ্যেই নাম লিখিয়েছে বেশ কয়েকটি দেশ এবং ঔষধ কোম্পানী। বিভিন্ন দেশে শুরু হয়েছে টিকা কার্যক্রম। যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানগণ ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন নিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে- বাংলাদেশের মানুষ কবে পাচ্ছে ভ্যাকসিন? আমরা আশা করতেই পারি যে জাতিসংঘের গত অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত ‘বহুপাক্ষিতা’ নীতিই আমাদের সময়মতো ভ্যাকসিন এনে দিবে পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে।

সোমবার বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণলালয় করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে জানিয়েছে, চীনের কাছে ভ্যাকসিনের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে শুধুমাত্র ট্রায়ালের জন্য সেটির অনুমোদন দেয়া হবে। পাশাপাশি চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই ভারত থেকে ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে, যার জন্য অগ্রিম বাবদ ১২০ মিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যেই তাদের প্রদান করা করা হয়েছে। -জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

বর্তমানে যেসকল ভ্যাকসিন বিশ্ব বাজারে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তা তুলে ধরা হলো-

স্পুৎনিক-৫ (রাশিয়া):

বিশ্বের প্রথম রেজির্স্টার্ড কোভিড ভ্যাকসিন রাশিয়ার স্পুৎনিক-৫। এটি একটি ভাইরাল ভেক্টর ভিত্তিক ভ্যাকসিন যা ইতোমধ্যে ঐ দেশটির ৮লাখ জনগণের দেহে টিকা হিসেবে প্রয়োগ করা হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্খার টপ-১০ লিস্টে এটি নিজের অবস্থান করে নিয়েছে। ৪০ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর ওপর সফল পরীক্ষা চালানো এ ভ্যাকসিনটি মধ্যপ্রাচ্য, ভারত, ভেনেজুয়েলা ও বেলারুশে ক্লিনিকাল ট্রায়াল সম্পন্ন করেছে। ভ্যাকসিনটির কার্যকারিতার হার ৯১দশমিক ৪শতাংশ, ডোজ দু’টি। ২ থেকে ৮ ডিগ্রী সেলসিয়াসে এটি সংরক্ষণ করা যায়।

বঙ্গভ্যাক্স (বাংলাদেশ):

ভ্যাক্সিন তৈরির দৌড়ে থাকা একমাত্র বাংলাদেশি কোম্পানি ‘গ্লোব বায়োটেক’। প্রথমে ‘ব্যানকোভিড’ নাম রাখলেও পরে স্বাস্থ্য সচিব আবদুল মান্নানের প্রস্তাবে তারা ভ্যাকসিনটির নাম বদলে রাখেন ‘বঙ্গভ্যাক্স’। গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেকের তৈরি নতুন করোনাভাইরাসের টিকা এখনও পরীক্ষামূলক প্রয়োগে যায়নি। সারা বিশ্বে যেসব টিকা তৈরির কাজ হচ্ছে সেগুলো পর্যবেক্ষণ করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এর মধ্যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যায়ে আছে এমন ৪২টি টিকার একটি তালিকা এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের আগের অবস্থায় (প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল) থাকা ১৫৬টি টিকার আরেকটি তালিকা রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার। ওই তালিকায় গ্লোব বায়োটেকের টিকার নাম রয়েছে।

সিনোভ্যাক (চীন):

করোনার ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের দৌড়ে সর্বপ্রথম নাম লিখিয়েছে চীনের বেইজিং ভিত্তিক ঔষধ কোম্পানী সিনোভ্যাক-সিনোফার্ম। তাদের উদ্ভাবিত ‘করোনাভ্যাক’ ভ্যাকসিনটি কোভিড টিকা হিসেবে প্রথম গণহারে ব্যবহৃত হয় যদিও তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদন পায়নি। গত ৩০ ডিসেম্বর জানা যায় যে এটি ৭৯ শতাংশ কার্যকর। পরে সংযুক্ত আরব অমিরাতে চলা ফেজ ট্রায়ালে এটির কার্যকারিতা ৮৬ শতাংশ উল্লেখ করা হয়।

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন (যুক্তরাজ্য):

লন্ডনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্রিটিশ ফার্মাসিটিউক্যাল অ্যাস্ট্রোজেনিকা’র যৌথ উদ্যোগে উদ্ভাবিত করোনার ভ্যাকসিনটি মানব দেহে প্রয়োগের পর শতকরা ৭০জন কোভিড আক্রান্ত রোগী সেরে উঠছেন। হিউম্যান ট্রায়ালে এমন রিপোর্ট পাওয়ার পর গত ৩০ডিসেম্বর এই ভ্যাকসিনটি চূড়ান্তভাবে ব্যবহারের জন্য অনুমোদন পায়। এখন পর্যন্ত ২০ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর ওপর সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে এই ভাইরাল ভেক্টর ভিত্তিক ভ্যাকসিনটি। ট্রায়ালের রিপোর্ট বিশ্লেষন করে জানা যায়, এই ভ্যাকসিনটি বয়স্ক ব্যক্তিদের দেহে চমৎকারভাবে কাজ করছে এবং এর সবগুলো ডোজ নিখুতভাবে প্রয়োগে এটি ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর হতে সক্ষম। এটির ডোজ দু’টি।

ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য ১০০ মিলিয়ন ডোজ অর্ডার করেছে।ভ্যাকসিনটির বিশেষতঃ হলো এটি অন্যান্য ভ্যাকসিনের তুলনায় সহজভাবে প্রয়োগ করা যায় এটি খুব ঠান্ডা তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করার প্রয়োজন হয় না। শিম্পাঞ্জির একটি সাধারণ কোল্ড ভাইরাসের দুর্বল সংস্করণ থেকে তৈরি করা হয়েছে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রোজেনিকা ভ্যাকসিনটি যা মানুষের মধ্যে বৃদ্ধি না পাওয়ার জন্য পরিবর্তন করা হয়েছে।

ফাইজার-বায়োএনটেক (যুক্তরাষ্ট্র-জার্মানি)

গত বছরের ২নভেম্বর ফাইজার-বায়োএনটেক এর ভ্যাকসিনটি গণটিকা হিসেবে প্রয়োগের অনুমোদন পায়।

এখন পর্যন্ত ৪৩ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর ওপর ভ্যাকসিনটি সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে, যা ৯৫ শতাংশ কার্যকর। ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে ভ্যাকসিনটি দু’টি ডোজে রোগীকে নিতে হয়। এরই মধ্যে যুক্তরাজ্য ৪০ মিলিয়ন ডোজ অর্ডার করেছে। ভ্যাকসিনটি মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সংরক্ষণ করতে হয় যা ড্রাই আইস সম্বলিত বিশেষ বাক্সে পরিবহনযোগ্য। এটি একটি আরএনএ ভিত্তিক ভ্যাকসিন।

গত ২ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহারের জন্য ফাইজার-বায়োএনটেক ভ্যাকসিনটি অনুমোদন পায়। দেশটিতে ভ্যাকসিন গ্রহণকারী প্রথম ব্যাক্তি ৯০বছর বয়সী মার্গারেট কেনেন কোভেন্ট্রির। এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের ৬০ লাখেরও বেশি লোক এই টিকাটি গ্রহণ করেছে।

মর্ডানা (যুক্তরাষ্ট্র):

৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর উপর এই ভ্যাকসিনের ক্লিনিকাল ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে। ট্রায়ালের রিপোর্টে বলা হয়েছে করোনা দমনে ৯৪দশমিক১ শতাংশ সক্ষম এই ভ্যাকসিনটি। যদিও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে জ্বর, মাথাব্যাথা, ক্লান্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে সেগুলির কোনওটিই তেমন মারাত্মক প্রভাব ফেলবে না বলে দাবি করেছে প্রস্তুতকারক সংস্থা। ভ্যাকসিনটি মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সংরক্ষণ করতে হয়। তবে বেশকিছু নেগেটিভ খবর পাওয়া যাচ্ছে ভ্যাকসিনটিকে কেন্দ্র করে। এটিও একটি আরএনএ ভিত্তিক ভ্যাকসিন।

জানা যায় ভ্যাকসিনটি নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু শরীর জুড়ে চুলকানি- অ্যালার্জির ঘটনা ঘটে, অসাড় হয়ে পড়ে জিভ, মাথা ঘোরে ও হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন বস্টন মেডিকেল সেন্টারের অঙ্কোলজিস্ট হোসেন সাদরাজাডেহ। মার্কিন গণমাধ্যমে বিষয়টি জানিয়েছেন তিনি।

‘কোভিশিল্ড’ ও ‘কোভ্যাক্সিন’ (ভারত):

ভারতের পুণের সিরাম ইনস্টিটিউটের ‘কোভিশিল্ড’ এবং হায়দরাবাদের ভারত-বায়োটেকের ‘কোভ্যাক্সিন’ কে করোনার কার্যকরী টিকা হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল অব ইন্ডিয়া (ডিসিজিআই)। যদিও ভারত-বায়োটেকের কোভ্যাক্সিন এখনও ক্লিনিকাল ট্রায়াল মোডে রয়েছে।

গতকাল সোমবার প্রস্তুকারক সংস্থাকে ডিসিজিআই ১২ বছর বয়সের উর্দ্ধে শিশুদের উপর এই টিকা পরীক্ষা করার অনুমোদন দিয়েছে। কোভ্যাক্সিন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর সহযোগিতায় ভারত-বায়োটেক দেশীয়ভাবে তৈরি করেছে।

অপরদিকে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার সহযোগিতায় সিরামের ‘কোভিশিল্ড’ ১৮ বছর উর্দ্ধে অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্কদের উপর পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত হয়েছে।

দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাক্তার হর্ষ বর্ধন গত রবিবার জানান, কোভ্যাক্সিনের জন্য জরুরি অনুমোদনের বিষয়টি সিরাম ইনস্টিটিউটের কোভিশিল্ডের চেয়ে আলাদা, কারণ কোভ্যাক্সিন এখনও পর্যন্ত ‘ক্লিনিকাল ট্রায়াল মোড’ অর্থাৎ পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণ তৃতীয় ধাপে। যারা কোভ্যাক্সিন গ্রহণ করবেন তাদের নজরে রাখা হবে এবং কী ধরণের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে সেই সব বিষয় কেন্দ্রকে রিপোর্ট দিতে হবে।

কোভিশিল্ড এবং কোভ্যাক্সিনের ডোজ দু’টি। ভ্যাকসিন দু’টি ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে সংরক্ষণ করতে হবে।