লন্ডন ০১:০০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিএনপির দ্বন্দ্বে সুযোগ পাচ্ছে জামায়াত: দিরাই শাল্লায় নতুন সমীকরণ

সুনামগঞ্জের হাওরঘেরা জনপদ দিরাই-শাল্লা উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-২ সংসদীয় আসন নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। মোট ৬৮১.৯৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ আসনে রয়েছে ১টি পৌরসভা, ১৩টি ইউনিয়ন এবং ৩৬৪টি গ্রাম। সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ১৭ হাজারের বেশি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এ আসনে বিএনপি একবার এবং জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক একবার জয়ী হয়েছে। বাকী সময়ের প্রায় সব নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ রাজনীতিক প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।

স্বাধীনতার পর জামায়াত ইসলামের অবস্থান এ আসনে কখনোই শক্তিশালী ছিল না। তবে গত ৫ আগস্ট দেশব্যাপী রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলের পর জামায়াত তাদের সাংগঠনিক ঘাটতি পূরণ এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে দৃশ্যমান চেষ্টা চালাচ্ছে। দিরাই ও শাল্লার গ্রাম ও হাট-বাজারে তাদের নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা বাড়ার কারণে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিএনপি দীর্ঘ সময় রাজপথে থাকলেও প্রার্থী নির্ধারণে স্থায়ী সংকট সৃষ্টি হলে জামায়াত সুযোগ নিতে শুরু করে বলে মাঠ পর্যায়ে মন্তব্য পাওয়া যায়।

বিএনপি সূত্রে জানা যায়, প্রথমে দলীয়ভাবে নাসির উদ্দিন চৌধুরীকে প্রার্থী করা হয়। নাসির চৌধুরীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেলের নাম বিবেচনা করা হয়। পরে পাবেল চৌধুরীকেও দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। যদিও এখন পর্যন্ত বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়নি যে দুইজনের মধ্যে কে চূড়ান্ত দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন, তবে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে নাসির চৌধুরীর শারীরিক অবস্থার কারণে শেষ পর্যন্ত পাবেল চৌধুরীকেই প্রার্থী করা হতে পারে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বিলম্বিত হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে বিএনপির ভোট ব্যাংক ঐক্যবদ্ধ আছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে, জামায়াতের আলোচিত আইনজীবী ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় নেতা শিশির মনির এ আসনে নির্বাচনী প্রচারে নেমে শুরু থেকেই চমক সৃষ্টি করেছেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় তিনি তৃণমূলের কিছু নেতাকে পাশে টানতে সক্ষম হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার উঠান বৈঠকে স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা বাড়লেও সচেতন মহল মনে করছেন এটি বিএনপি বিভক্তির সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা।

স্থানীয় বাসিন্দা মশিউর রহমান বলেন, দিরাই-শাল্লায় ভোট ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপিমুখী হলেও দলীয় বিভাজনের কারণে জামায়াত তাদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। ৫ আগস্টের পর তারা হাওর অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

দিরাই বাজারের ব্যবসায়ী শাহ জামান বলেন, জামায়াত আগে কখনো এভাবে মাঠে নামেনি। বিএনপির ঝামেলা দেখে তারা সুযোগ নিতে চাইছে।

কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, বিএনপি যদি একজোট না হয়, ভোট ছিটকে যাবে এটাই এখন সবচেয়ে বড় ভয়।

রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দীর্ঘ চার দশক এ আসনটিতে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক প্রভাব ও কূটনৈতিক সক্ষমতার কারণে অন্য দলগুলো খুব কমই জায়গা করে নিতে পেরেছে। তিনি না থাকায় এ আসনে এখন নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে, সুনামগঞ্জ-২ আসনকে ঘিরে এবারের রাজনৈতিক লড়াই হবে তিনমুখী বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংকট সামলে মাঠ ধরে রাখার লড়াই, জামায়াতের ঐতিহাসিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা, এবং আওয়ামী লীগের ঘরানার ভোট কীভাবে পুনর্বণ্টিত হবে তা নিয়ে অজানা হিসাব। ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত কোন শক্তি কতটা সংগঠিত থাকতে পারে এটাই নির্ধারণ করবে দিরাই-শাল্লার রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিক।

এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন, বিএনপির নাসির উদ্দিন চৌধুরী ও তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ শিশির মনির, খেলাফত মজলিসের সাখাওয়াত হোসেন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মোহাম্মদ সোয়াইব আহমদ এবং সিপিবির নিরঞ্জন দাস।

ট্যাগ:
জনপ্রিয়

বিএনপির দ্বন্দ্বে সুযোগ পাচ্ছে জামায়াত: দিরাই শাল্লায় নতুন সমীকরণ

বিএনপির দ্বন্দ্বে সুযোগ পাচ্ছে জামায়াত: দিরাই শাল্লায় নতুন সমীকরণ

প্রকাশের সময়: ০৪:৩৭:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

সুনামগঞ্জের হাওরঘেরা জনপদ দিরাই-শাল্লা উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-২ সংসদীয় আসন নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। মোট ৬৮১.৯৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ আসনে রয়েছে ১টি পৌরসভা, ১৩টি ইউনিয়ন এবং ৩৬৪টি গ্রাম। সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ১৭ হাজারের বেশি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এ আসনে বিএনপি একবার এবং জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক একবার জয়ী হয়েছে। বাকী সময়ের প্রায় সব নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ রাজনীতিক প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।

স্বাধীনতার পর জামায়াত ইসলামের অবস্থান এ আসনে কখনোই শক্তিশালী ছিল না। তবে গত ৫ আগস্ট দেশব্যাপী রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলের পর জামায়াত তাদের সাংগঠনিক ঘাটতি পূরণ এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে দৃশ্যমান চেষ্টা চালাচ্ছে। দিরাই ও শাল্লার গ্রাম ও হাট-বাজারে তাদের নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা বাড়ার কারণে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিএনপি দীর্ঘ সময় রাজপথে থাকলেও প্রার্থী নির্ধারণে স্থায়ী সংকট সৃষ্টি হলে জামায়াত সুযোগ নিতে শুরু করে বলে মাঠ পর্যায়ে মন্তব্য পাওয়া যায়।

বিএনপি সূত্রে জানা যায়, প্রথমে দলীয়ভাবে নাসির উদ্দিন চৌধুরীকে প্রার্থী করা হয়। নাসির চৌধুরীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেলের নাম বিবেচনা করা হয়। পরে পাবেল চৌধুরীকেও দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। যদিও এখন পর্যন্ত বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়নি যে দুইজনের মধ্যে কে চূড়ান্ত দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন, তবে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে নাসির চৌধুরীর শারীরিক অবস্থার কারণে শেষ পর্যন্ত পাবেল চৌধুরীকেই প্রার্থী করা হতে পারে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বিলম্বিত হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে বিএনপির ভোট ব্যাংক ঐক্যবদ্ধ আছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে, জামায়াতের আলোচিত আইনজীবী ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় নেতা শিশির মনির এ আসনে নির্বাচনী প্রচারে নেমে শুরু থেকেই চমক সৃষ্টি করেছেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় তিনি তৃণমূলের কিছু নেতাকে পাশে টানতে সক্ষম হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার উঠান বৈঠকে স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা বাড়লেও সচেতন মহল মনে করছেন এটি বিএনপি বিভক্তির সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা।

স্থানীয় বাসিন্দা মশিউর রহমান বলেন, দিরাই-শাল্লায় ভোট ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপিমুখী হলেও দলীয় বিভাজনের কারণে জামায়াত তাদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। ৫ আগস্টের পর তারা হাওর অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

দিরাই বাজারের ব্যবসায়ী শাহ জামান বলেন, জামায়াত আগে কখনো এভাবে মাঠে নামেনি। বিএনপির ঝামেলা দেখে তারা সুযোগ নিতে চাইছে।

কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, বিএনপি যদি একজোট না হয়, ভোট ছিটকে যাবে এটাই এখন সবচেয়ে বড় ভয়।

রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দীর্ঘ চার দশক এ আসনটিতে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক প্রভাব ও কূটনৈতিক সক্ষমতার কারণে অন্য দলগুলো খুব কমই জায়গা করে নিতে পেরেছে। তিনি না থাকায় এ আসনে এখন নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে, সুনামগঞ্জ-২ আসনকে ঘিরে এবারের রাজনৈতিক লড়াই হবে তিনমুখী বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংকট সামলে মাঠ ধরে রাখার লড়াই, জামায়াতের ঐতিহাসিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা, এবং আওয়ামী লীগের ঘরানার ভোট কীভাবে পুনর্বণ্টিত হবে তা নিয়ে অজানা হিসাব। ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত কোন শক্তি কতটা সংগঠিত থাকতে পারে এটাই নির্ধারণ করবে দিরাই-শাল্লার রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিক।

এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন, বিএনপির নাসির উদ্দিন চৌধুরী ও তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ শিশির মনির, খেলাফত মজলিসের সাখাওয়াত হোসেন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মোহাম্মদ সোয়াইব আহমদ এবং সিপিবির নিরঞ্জন দাস।