প্রবাসী অধ্যুষিত নির্বাচনী এলাকা হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ) আসন। এখানে জাতীয় থেকে স্থানীয় নির্বাচনে বহুকাল আগে থেকেই প্রবাসীরা প্রার্থী হয়ে আসছেন। এবারও তাই হয়েছে। এবার এই আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাবেক ছাত্রদল নেতা মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ।
অপরদিকে, দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের যুক্তরাজ্যের নেতা আনোয়ার হোসেন। দুজনেই দীর্ঘদিন হয় যুক্তরাজ্যে ছিলেন। রিটার্নিং অফিসে যাচাই-বাছাইয়ে মনোনয়ন বৈধ হয়েছে দুজনের। তবে তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ এনে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছেন। তাদের এই লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছেন আরও দুই প্রার্থী।
৩ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইকালে ৯ প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ এনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরে বাগ্বিতণ্ডা হয় আনোয়ার ও কয়ছর আহমেদের। ওইদিনই রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার সময় ব্যারিস্টার আনোয়ার ইঙ্গিত দেন আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার ব্যাপারে।
পরে নির্বাচন কমিশনে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে চারটি আপিল মামলা দায়ের হয় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী কয়ছর আহমেদকে দ্বৈত নাগরিক উল্লেখ করে। হলফনামায় তথ্য গোপনের অভিযোগ এনে তাঁর মনোনয়ন বাতিলের জন্য বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ার হোসেন নির্বাচন কমিশনে ৮ জানুয়ারি আপিল মোকদ্দমা দায়ের করেন। একই অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ইয়াসীন খান আপিল মোকদ্দমা দায়ের করেন। অপরদিকে, কয়ছর আহমেদ স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ এনে আপিল মোকদ্দমা দায়ের করেন। একই অভিযোগে স্বতন্ত্র প্রার্থী হুসাইন আহমেদ আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আপিল মোকদ্দমা দায়ের করেন।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থীদের পরস্পরের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের বিষয়টি জেলাজুড়ে আলোচিত। আগামীকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় আনোয়ার হোসেনের দায়ের করা মামলার শুনানি। এর পরদিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হুসাইন আহমেদের দায়ের করা মামলার শুনানি।
মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদের বিরুদ্ধে করা মামলার শুনানি ১৭। একই দিনে মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদের দায়ের করা মামলার শুনানি। নির্বাচন কমিশনের শুনানির আগে পর্যন্ত ব্রিটেন থেকে আসা এই দুই বিএনপি নেতা স্নায়ুচাপে রয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এসব মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন বলেন, তিনি ব্রিটিশ নাগরিক কোনো সময়ই ছিলাম না। তাঁর জানামতে, কয়ছর নিজে ঘোষণা দিয়ে এসেছেন, তিনি ব্রিটিশ সিটিজেন। আনোয়ার হোসেনের দাবি নির্বাচন কমিশনে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে।
কয়ছর আহমেদ বলেন, যেহেতু বিষয়টি শুনানির অপেক্ষায় মন্তব্য করতে চান না। ব্যারিস্টার আনোয়ারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর মন্তব্য, তিনি আগে কারও বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা অভিযোগ করেননি।
জগন্নাথপুরের বাসিন্দা প্রবীণ বিএনপির নেতা মল্লিক মঈন উদ্দিন সোহেল বলেন, কয়ছর আহমেদ ব্রিটিশ সিটিজেন হওয়ার জন্য আবেদনই করেননি। এই অভিযোগ ভিত্তিহীন। তিনি জানান, জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ প্রবাসী অধ্যুষিত নির্বাচনী এলাকা। এই আসনের বিপুল সংখ্যক ভোটার যুক্তরাজ্য প্রবাসী। বহুকাল আগে থেকেই প্রবাসীরা এখানকার স্থানীয় থেকে জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে জয়ী হয়েছেন। জনপ্রতিনিধিত্ব করেছেন। এখনও করছেন। জগন্নাথপুরের বেশির ভাগ ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যানও লন্ডন প্রবাসী।
জামায়াতের প্রার্থী ইয়াসীন খান বলেন, জনগণের সেবা করাও ইবাদত। ইবাদত করতে এসে ভুল তথ্য বা তথ্য গোপন করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। জনগণের স্বার্থে এই আপিল করা।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২-এ উল্লেখ রয়েছে, কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা হারাবেন যদি তিনি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন।
এদিকে গত সোমবার দ্বৈত নাগরিকত্বের জটিলতায় চট্টগ্রাম-৯ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে নির্বাচন কমিশন।
সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে ফজলুল হকের আপিল শুনানি শেষে আবেদনটি নামঞ্জুর করা হয়। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফজলুল হক নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য নন। এর আগে গত চার জানুয়ারি দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে তাঁর মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেওয়া হলফনামায় এ কে এম ফজলুল হক দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের কথা উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন বলে জানান এবং গত ২৮ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন বলেও উল্লেখ করেন। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানানো হয়, হলফনামায় নাগরিকত্ব ত্যাগের কথা উল্লেখ থাকলেও এর স্বপক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য নথিপত্র দাখিল করা হয়নি। এ কারণে তাঁর মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
নির্বাচনী তপশিল অনুযায়ী ১৮ জানুয়ারি আপিল মোকদ্দমা নিষ্পত্তির শেষ দিন। ২০ জানুয়ারি প্রত্যাহার, ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ ও ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ হবে।
কালনী ভিউ ডেস্কঃ 
















