অপারেশনের রোগী স্ত্রী মোছা. বিনা বেগম (২৫) হাসপাতালে ভর্তি। এরমধ্যে স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক কলহ জের ধরে অসুস্থ্য স্ত্রীকে হাসপাতালে ফেলে রেখেই মাত্র ২ মাসের দুধের শিশু মো. আতিকুলকে নিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন স্বামী। সন্তানকে কাছে না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন স্ত্রী। অন্যদিকে মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বার বার কাঁদছিল শিশুটিও।
খবর পেয়ে সোমবার শিশুটিকে উদ্ধার করে স্বামীর মাধ্যমেই আবারও হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন সুনামগঞ্জের দিরাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম। শিশুটি সন্ধ্যার সময় তার মায়ের কাছে ফিরেছে বলে জানা গেছে।
সোমবার ভোরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুরাতন ভবনের ৪র্থ তলার ৫ নং ওয়ার্ড থেকে শিশুটিকে নিয়ে আসেন তার বাবা মো. নিপুন মিয়া (৩০) । খবর পেয়ে দুপুরে শিশুটিকে উদ্ধার করেন দিরাই থানার ওসি। অভিযুক্ত নিপুন মিয়ার বাড়ি দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের ভাটিয়াগাঁও গ্রামে।
জানা যায়, প্রায় ১২ বছর আগে দিরাই উপজেলার ভাটিয়াগাঁও গ্রামের মো. নিপুন মিয়ার সাথে পারিবারকিভাবে বিয়ে হয় হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বানর এলাকার বিনা বেগমের। তাদের চারটি সন্তান রয়েছে। প্রথম সন্তান মেয়ের বয়স ৮ বছর, দ্বিতীয় সন্তান ছেলের বয়স ৬ বছর, তৃতীয় সন্তান মেয়ের বয়স ৫ বছর। তিন সন্তান বাড়িতে আছে তার দাদা ও চাচা-চাচীর কাছে। মাস খানেক আগে স্ত্রী বিনা বেগমের পিত্তনালীতে পাথর ধরা পড়ে। ২০ দিন আগে তিনি ভর্তি হন এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। গত ৮ দিন আগে অপারেশন করে পিত্তনালী থেকে পাথর অপসারণ করা হয়। জমি বিক্রি করে দিনমজুর জামাতার পাশে দাঁড়ান শ্বাশুড়ি মিনারা বেগম।
এদিকে স্বামীর ইচ্ছে শ্বাশুড়ির জমির বিক্রির সকল টাকা তার নিজের কাছে রাখতে। এনিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ হয়। এর জের ধরে অসুস্থ্য স্ত্রীকে হাসপাতালের বিছানায় ফেলে রেখেই দুই মাসের দুধের শিশু মো. আতিকুলকে নিয়ে বাড়ি চলে আসেন স্বামী।স্বামী ও সন্তানকে হাসপাতালে না পেয়ে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকে জানান অসুস্থ্য বিনা বেগম। পুলিশ হাসপাতালের সিসিটি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষন করে দেখতে পান আজ ভোর ৫ টার দিকে শিশু আতিকুলকে নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছেন তার বাবা মো. নিপুন মিয়া ও দাদী রাজিয়া বেগম।
হাসপাতাল থেকে সাথে সাথে বিষয়টি দিরাই থানা পুলিশকে অবগত করা হয়। এরপর দিরাই থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম ভাটিয়াগাঁও গ্রামে গিয়ে শিশু আতিকুলকে উদ্ধার করেন। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে নিপুন মিয়াকে বুঝিয়ে তার মাধ্যমেই আবারও স্ত্রীর কাছে শিশু সন্তানকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সন্ধ্যা ৬ টার দিকে শিশুটিকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছেন তার বাবা।মোছা. বিনা বেগম বলেন, ২০ দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। চিকিৎসার জন্য আমার মা দেড় লাখ টাকার জমি বিক্রি করেছেন। ৮ দিন আগে অপারেশন হয়েছে, ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আমার স্বামী চায় সব টাকা তার কাছে রাখতে। এনিয়ে মনোমানিল্য হওয়ায় আমার স্বামী গত রাত থেকেই ছেলেকে আমার কাছে দেয়নি। ভোরে আমাকে না জানিয়ে আমার দুধের সন্তানকে নিয়ে বাড়িতে চলে গেছেন। হাসপাতালের পুলিশকে জানানোর পর তারা সিসি ক্যামেরায় দেখেছেন ভোর ৫ টার দিয়ে ছেলেকে নিয়ে বের হয়ে গেছেন আমার স্বামী ও শাশুড়ি। পুলিশকে জানানোর পর সন্ধ্যার দিকে ছেলেকে হাসপাতালে আনা হয়েছে।’তিনি আরও বলেন, আমার স্বামী দিনমজুর, কাম কাজ করেই সংসার চালান। যা রোজগার হয় তা দিয়েই সংসার চালাচ্ছি। কিন্তু প্রায়ই আমাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেন ও মারধর করেন। তবুও স্বামী-সন্তানের মুখ চেয়ে সব সহ্য করছি। ’নিপুন মিয়া বলেন, স্ত্রীর সাথে আমার কথা কাটাকাটি হয়েছে। মাথা গরম হয়েছিল, তাই ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে এসেছিলাম। ওসি স্যার আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, আবার ছেলেকে নিয়ে তার মায়ের কাছে যাচ্ছি।
’দিরাই থানার অফিসার (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, স্বামী-স্ত্রীর কলহের জের ধরে অসুস্থ স্ত্রীকে হাসপাতালে ফেলে রেখেই দুই মাসের শিশু সন্তানকে নিয়ে বাড়িতে চলে এসেছিল স্বামী। হাসপাতাল থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুটিকে উদ্ধার করে স্বামীকে বুঝিয়ে আবারও তার স্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, এত ছোট শিশু মা ছাড়া কীভাবে থাকবে ? এছাড়া হাসপাতাল থেকে জানানো হয়েছে সন্তান কাছে না থাকায় মায়েরও কষ্ট হচ্ছে। তাই খবর পাওয়ার পরপরই নৌকা নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
কালনী ভিউ ডেস্কঃ 

















