লন্ডন ০৫:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সুনামগঞ্জ-২ দিরাই-শাল্লা

নাছির-শিশিরের লড়াইয়ে আ. লীগের ভোটই ‘কিংমেকার’

{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":["local"],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":false,"containsFTESticker":false}

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তে এসে সুনামগঞ্জ-০২ দিরাই-শাল্লা আসনে জমে উঠেছে রাজনৈতিক উত্তাপ।

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নাছির উদ্দীন চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ শিশির মনিরের মধ্যে চলছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।

মাঠের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক। সেই ভোট কোন দিকে যাবে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে শেষ হাসি কার মুখে উঠবে।

দিরাই ও শাল্লা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬ হাজার ৫২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৫২ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৫১ হাজার ৩৯৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ জন। দুই উপজেলা মিলিয়ে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১১১টি। বড় এই ভোটারভিত্তিক আসনে শেষ মুহূর্তের ভোটের গতিপ্রকৃতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। গত কয়েক দিন ধরে দিরাই ও শাল্লার হাট-বাজার, চা-স্টল, গ্রাম্য মোড় ও নৌ-ঘাট এলাকায় একটাই আলোচনা নাছির না শিশির। নবীন ভোটারদের একটি অংশ পরিবর্তনের পক্ষে কথা বললেও প্রবীণ ভোটারদের বড় অংশ বিবেচনা করছেন অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতা। ফলে এই লড়াই অনেকটা রূপ নিয়েছে নবীন বনাম প্রবীণের ভোটযুদ্ধে।

এদিকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ভোট বর্জনের ডাক দিলেও দিরাই-শাল্লার মাঠ পর্যায়ের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। স্থানীয় রাজনীতিক ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রার্থী না থাকলেও আওয়ামী লীগের বড় একটি ভোটব্যাংক নীরবে হিসাব-নিকাশ করছে। সেই ভোট কোন দিকে যাবে তা নিয়েই মূলত দুই শিবিরই কৌশলী ও আশাবাদী।

আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে স্থানীয়ভাবে নাছির চৌধুরীর ভোটব্যাংক নামে পরিচিত কমিউনিটির বড় একটি অংশ এবার জামায়াত প্রার্থী শিশির মনিরের দিকে ঝুঁকেছে। এই ভোটের সরে যাওয়া সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

দিরাই বাজারের ব্যবসায়ী ও প্রবীণ ভোটার আব্দুল করিম বলেন, আমরা বহু নির্বাচন দেখেছি। শেষ পর্যন্ত এখানে আওয়ামী লীগের ভোট যেদিকে যাবে, ফলাফলও অনেকটা সেদিকেই যাবে। নাছির চৌধুরীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও পরিচিতি তাকে এগিয়ে রাখছে।

অন্যদিকে শাল্লার তরুণ ভোটার রাশেদ মিয়া বলেন, শিশির মনির নতুন মুখ হলেও এলাকায় নিয়মিত আসছেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। তরুণদের বড় একটা অংশ পরিবর্তন চায়। তাই এবার লড়াইটা খুব সহজ হবে না।

বিএনপি সমর্থকদের দাবি, নাছির উদ্দীন চৌধুরী এই আসনে পরীক্ষিত ও পরিচিত নেতা। অতীতের রাজনৈতিক আন্দোলন- সংগ্রাম ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তাঁকে বাড়তি সুবিধা দেবে।

বিএনপি নেতা জুবের সর্দার বলেন, জনগণের সঙ্গে নাছির চৌধুরীর সম্পর্ক পুরোনো। শেষ সময়ে অনেক নিরপেক্ষ ও আওয়ামী লীগের ভোটও আমাদের দিকেই আসবে বলে আমরা আশাবাদী।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের ভাষ্য, দিরাই-শাল্লায় দলটির সাংগঠনিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হলেও গত ৫ আগস্টের পর থেকে প্রার্থী মোহাম্মদ শিশির মনির ধারাবাহিক মাঠপর্যায়ের তৎপরতায় দলকে কিছুটা সংগঠিত করতে পেরেছেন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ইমেজ ও সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে তিনি দলীয় গণ্ডির বাইরেও সমর্থন পাচ্ছেন বলে দাবি করছেন তাঁর অনুসারীরা।

জামায়াত কর্মী আবু সালেহ বলেন, শিশির মনির শিক্ষিত, ভদ্র ও ক্লিন ইমেজের রাজনীতিক। মানুষ এবার নতুন ও সৎ নেতৃত্ব চায়। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

এ ছাড়া এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী এডভোকেট নিরঞ্জন দাশ খোকন। তিনি সীমিত পরিসরে প্রচারণা চালিয়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম বণ্টনের কথা তুলে ধরছেন। ভোটের হিসাবে তিনি পিছিয়ে থাকলেও আদর্শিক রাজনীতির অবস্থান তুলে ধরছেন বলে মনে করছেন অনেকেই।

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মতে, এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকায় তাদের ভোটই হয়ে উঠেছে ‘কিংমেকার’। সেই ভোট কোন দিকে ভাগ হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে চূড়ান্ত ফলাফল। ৩ লাখের বেশি ভোটারের রায়ই ঠিক করে দেবে কে বসবেন জাতীয় সংসদে।

সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জ-২ দিরাই-শাল্লা আসনে এবার লড়াইটা শুধু বিএনপি বনাম জামায়াত নয়, এটি একই সঙ্গে অভিজ্ঞতা বনাম পরিবর্তন, প্রবীণ বনাম নবীনেরও লড়াই। শেষ পর্যন্ত কে হাসবে শেষ হাসি, তা জানতে অপেক্ষা এখন শুধু ভোটের রায় ঘোষণার।

ট্যাগ:

নাছির-শিশিরের লড়াইয়ে আ. লীগের ভোটই ‘কিংমেকার’

সুনামগঞ্জ-২ দিরাই-শাল্লা

নাছির-শিশিরের লড়াইয়ে আ. লীগের ভোটই ‘কিংমেকার’

প্রকাশের সময়: ০৩:৩৪:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তে এসে সুনামগঞ্জ-০২ দিরাই-শাল্লা আসনে জমে উঠেছে রাজনৈতিক উত্তাপ।

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নাছির উদ্দীন চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ শিশির মনিরের মধ্যে চলছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।

মাঠের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক। সেই ভোট কোন দিকে যাবে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে শেষ হাসি কার মুখে উঠবে।

দিরাই ও শাল্লা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬ হাজার ৫২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৫২ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৫১ হাজার ৩৯৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ জন। দুই উপজেলা মিলিয়ে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১১১টি। বড় এই ভোটারভিত্তিক আসনে শেষ মুহূর্তের ভোটের গতিপ্রকৃতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। গত কয়েক দিন ধরে দিরাই ও শাল্লার হাট-বাজার, চা-স্টল, গ্রাম্য মোড় ও নৌ-ঘাট এলাকায় একটাই আলোচনা নাছির না শিশির। নবীন ভোটারদের একটি অংশ পরিবর্তনের পক্ষে কথা বললেও প্রবীণ ভোটারদের বড় অংশ বিবেচনা করছেন অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতা। ফলে এই লড়াই অনেকটা রূপ নিয়েছে নবীন বনাম প্রবীণের ভোটযুদ্ধে।

এদিকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ভোট বর্জনের ডাক দিলেও দিরাই-শাল্লার মাঠ পর্যায়ের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। স্থানীয় রাজনীতিক ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রার্থী না থাকলেও আওয়ামী লীগের বড় একটি ভোটব্যাংক নীরবে হিসাব-নিকাশ করছে। সেই ভোট কোন দিকে যাবে তা নিয়েই মূলত দুই শিবিরই কৌশলী ও আশাবাদী।

আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে স্থানীয়ভাবে নাছির চৌধুরীর ভোটব্যাংক নামে পরিচিত কমিউনিটির বড় একটি অংশ এবার জামায়াত প্রার্থী শিশির মনিরের দিকে ঝুঁকেছে। এই ভোটের সরে যাওয়া সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

দিরাই বাজারের ব্যবসায়ী ও প্রবীণ ভোটার আব্দুল করিম বলেন, আমরা বহু নির্বাচন দেখেছি। শেষ পর্যন্ত এখানে আওয়ামী লীগের ভোট যেদিকে যাবে, ফলাফলও অনেকটা সেদিকেই যাবে। নাছির চৌধুরীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও পরিচিতি তাকে এগিয়ে রাখছে।

অন্যদিকে শাল্লার তরুণ ভোটার রাশেদ মিয়া বলেন, শিশির মনির নতুন মুখ হলেও এলাকায় নিয়মিত আসছেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। তরুণদের বড় একটা অংশ পরিবর্তন চায়। তাই এবার লড়াইটা খুব সহজ হবে না।

বিএনপি সমর্থকদের দাবি, নাছির উদ্দীন চৌধুরী এই আসনে পরীক্ষিত ও পরিচিত নেতা। অতীতের রাজনৈতিক আন্দোলন- সংগ্রাম ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তাঁকে বাড়তি সুবিধা দেবে।

বিএনপি নেতা জুবের সর্দার বলেন, জনগণের সঙ্গে নাছির চৌধুরীর সম্পর্ক পুরোনো। শেষ সময়ে অনেক নিরপেক্ষ ও আওয়ামী লীগের ভোটও আমাদের দিকেই আসবে বলে আমরা আশাবাদী।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের ভাষ্য, দিরাই-শাল্লায় দলটির সাংগঠনিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হলেও গত ৫ আগস্টের পর থেকে প্রার্থী মোহাম্মদ শিশির মনির ধারাবাহিক মাঠপর্যায়ের তৎপরতায় দলকে কিছুটা সংগঠিত করতে পেরেছেন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ইমেজ ও সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে তিনি দলীয় গণ্ডির বাইরেও সমর্থন পাচ্ছেন বলে দাবি করছেন তাঁর অনুসারীরা।

জামায়াত কর্মী আবু সালেহ বলেন, শিশির মনির শিক্ষিত, ভদ্র ও ক্লিন ইমেজের রাজনীতিক। মানুষ এবার নতুন ও সৎ নেতৃত্ব চায়। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

এ ছাড়া এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী এডভোকেট নিরঞ্জন দাশ খোকন। তিনি সীমিত পরিসরে প্রচারণা চালিয়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম বণ্টনের কথা তুলে ধরছেন। ভোটের হিসাবে তিনি পিছিয়ে থাকলেও আদর্শিক রাজনীতির অবস্থান তুলে ধরছেন বলে মনে করছেন অনেকেই।

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মতে, এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকায় তাদের ভোটই হয়ে উঠেছে ‘কিংমেকার’। সেই ভোট কোন দিকে ভাগ হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে চূড়ান্ত ফলাফল। ৩ লাখের বেশি ভোটারের রায়ই ঠিক করে দেবে কে বসবেন জাতীয় সংসদে।

সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জ-২ দিরাই-শাল্লা আসনে এবার লড়াইটা শুধু বিএনপি বনাম জামায়াত নয়, এটি একই সঙ্গে অভিজ্ঞতা বনাম পরিবর্তন, প্রবীণ বনাম নবীনেরও লড়াই। শেষ পর্যন্ত কে হাসবে শেষ হাসি, তা জানতে অপেক্ষা এখন শুধু ভোটের রায় ঘোষণার।