ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে ১৮ আসনে জয় পেয়েছে। বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন মাত্র দুজন। যে দুজনকে মন্ত্রী করা হয়েছে, সিলেটে বিএনপির রাজনীতিতে তারা দুই বলয়ের নেতা হিসেবে পরিচিত। এ জন্য বলা হচ্ছে, মন্ত্রী জুটি দিয়ে সিলেটে বিএনপির ‘পাওয়ার লাইন ব্যালেন্স’ করা হয়েছে।
নির্বাচন পরিচালনায় থাকা বিএনপির সূত্র বলছে, জাতীয় নির্বাচনের পর একই ফর্মুলা স্থানীয় নির্বাচনেও প্রয়োগ করে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী করা হবে। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা তথা ‘পাওয়ার ব্যালেন্সে’ চলছে নয়া নগরপিতার সন্ধান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সারা দেশে এক প্রজ্ঞাপনে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের প্রতিনিধিত্ব বাতিল করা হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালন করছেন সরকারি কর্মকর্তারা। বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে নাগরিক বিড়ম্বনাও তৈরি হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় নির্বাচনের মাধ্যমে এ বিড়ম্বনা ঘোচানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার। আগামী তিন মাসের মধ্যে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসায় সিসিক নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির কে প্রার্থী হচ্ছেন, তা নিয়ে চলছে আলোচনা।
জানা গেছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের চিঠি পেয়ে নির্বাচন কমিশনও তাদের প্রস্তুতি শুরু করেছে। আইন অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ১৮০ দিনের বাধ্যবাধকতা থাকায় ইসি প্রথম ধাপে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজন করতে যাচ্ছে। সূত্র জানায়, এই তিন সিটির পর পর্যায়ক্রমে সিলেটসহ বাকি ৯টি সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ঈদের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করার তাগাদায় বিএনপি মেয়র পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার বিষয়টি সাংগঠনিক এজেন্ডার মধ্যে এনেছে।
সর্বশেষ সিসিক নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। কিন্তু কাউন্সিলর পদে একাধিক বিএনপি নেতা বহিষ্কৃত হয়েও অংশ নিয়েছিলেন এবং উল্লেখযোগ্যরা বিজয়ীও হয়েছিলেন। মেয়র পদে তখন আওয়ামী লীগের আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বিজয়ী হলেও বিএনপির কাউন্সিলর-বেষ্টিত সিটি পরিষদ ছিল। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত কাউন্সিলররা অবশ্য ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে দলে ফিরেছেন। তাদের মধ্যে থেকে কেউ মেয়র পদে প্রার্থী না হয়ে বরং কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সিসিকের ৪২টি ওয়ার্ডে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট সীমানা সম্প্রসারণের পর সিসিকের আয়তন ২৬ দশমিক ৫০ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৭৯ দশমিক ৫০ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে সিসিক এলাকার মোট জনসংখ্যা ১০ লক্ষাধিক। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের বর্তমান মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ২৫ হাজার ৩৮৮ জন। সিসিক এলাকাটি দুটি সংসদীয় আসনে বিভক্ত। এর মধ্যে সিলেট-১ আসনের আওতাভুক্ত ৩৬টি ওয়ার্ড। মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৭৭২ জন। অন্যদিকে সিলেট-৩ আসনের আওতাভুক্ত ছয়টি ওয়ার্ডে মোট ভোটার ৩৯ হাজার ৬১৬ জন। মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রার্থী নির্ধারণে দুটি নির্বাচনি আসনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদেরও ভূমিকা থাকবে।
তবে দুই সংসদ সদস্যের প্রভাবের মধ্যে বড় রকম আলোচনা রয়েছে বিগত দুটি মেয়াদে সিসিক মেয়র পদে টানা নির্বাচিত হওয়া সাবেক মেয়র ও বর্তমানে সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর। তার বলয় থেকে কে প্রার্থী হচ্ছেন, এ নিয়ে চলছে আলোচনা। এর মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি আরিফুল হক চৌধুরীর নির্বাচন পরিচালনাকারী নেতাদের অন্যতম। ইতোমধ্যে তাকে মেয়র পদে দেখতে চেয়ে পোস্টারও সাঁটানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে প্রচার। আলোচনা আছে জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ব্যারিস্টার রিয়াসাদ আজিম হক আদনানও। তিনি সিসিকের প্রথম নির্বাচনে বিএনপি তথা চারদলীয় জোটের সমর্থনে মেয়র পদে নির্বাচন করা প্রয়াত এম এ হকের ছেলে। এ দুই তরুণ মুখের মধ্যে আছেন মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সিলেট ইউনিটের ভাইস চেয়ারম্যান বদরুজ্জামান সেলিমও। তিনি ২০১৮ সালে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে নির্বাচন করেছিলেন।
এদিকে নিজ থেকে ঘোষণা দিয়ে মাঠে তৎপর আছেন মহানগর বিএনপির পদধারী দুই নেতা। তাদের একজন মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরীও। তিনি বলেন, ‘দলীয় মনোনয়ন দিলে আরিফুল হক চৌধুরী যেভাবে সিসিকের উন্নয়ন করেছেন, তারচেয়ে বেশি উন্নয়ন করবেন।’ আরিফুল হক চৌধুরীর দুটি মেয়াদের সময়ে প্যানেল মেয়র পদে থাকা সিসিকের একাধিকবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর ও মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদীও মেয়র প্রার্থিতার আলোচনায় আছেন। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে সংসদ সদস্য বিজয়ী হয়ে সরকারের বাণিজ্য, শিল্প, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার মুক্তাদিরের প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট ছিলেন।
‘পাওয়ার ব্যালেন্সে’ আরেকটি নাম জাতীয় নির্বাচন শেষে উচ্চারিত হচ্ছে। তিনি হচ্ছেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ্ সিদ্দিকী। ২০২৪-এর আগস্ট-পরবর্তী ও পূর্ববর্তী সময়ে তিনি সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পদে ছিলেন। এরপর জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশায় মাঠে ছিলেন। শেষে আসনে সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়ায় মিফতাহ্ দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে সিলেট বিভাগের প্রায় সব কটি নির্বাচনি আসনে দলীয় প্রার্থীদের প্রচারে নেমে নিরবচ্ছিন্নভাবে সাংগঠনিক তৎপরতা চালান। বিএনপির একটি সূত্র জানায়, এ ফর্মুলায় ছাত্রদলের নেতৃত্ব দিয়ে বর্তমানে নিষ্ক্রিয় স্থানীয় নেতা, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বিএনপি নেতাসহ জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের নিয়ে একটি শর্টলিস্ট হয়েছে। এতে মিফতাহ্ সিদ্দিকীর নামটিও রয়েছে।
মিফতাহ্ সিদ্দিকীর সঙ্গে শনিবার রাতে কথা হয়। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থিতার তোড়জোড় শুরু হওয়ায় তার নামটিও সিসিকের মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার আলোচনায় এসেছে। তবে তিনি যেহেতু সাংগঠনিক দায়িত্বে রয়েছেন, তাই দলীয় চাওয়া-পাওয়ার আলোচনা নিজ থেকে বিরত বা সংযত থাকতে এ বিষয়ে ইতোমধ্যে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
নয়া নগরপিতার সন্ধান বিষয়ে কোনো কিছু না বলে আগামীর মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে জানিয়ে মিফতাহ্ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমাদের নেতা ও সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দিকে চোখ রাখতে হবে। এক শার্ট পরে তিনি তিন দিন কাটাচ্ছেন। সুতরাং পরিবর্তন কোনো নির্দেশনা দিয়ে বাস্তবায়ন নয়, দেখে দেখে নিজেকে নতুন করে প্রস্তুত করতে হবে।’
কালনী ভিউ ডেস্কঃ 
















