“দেশে আমাকে এক গ্লাস পানি নিজের হাতে তুলে খেতে হয়নি… আর এখন, সেই আমি প্রবাসে কী করছি” ফেসবুকে মাকে নিয়ে এমনই আবেগঘন কথাগুলো লিখেছিলেন ফাহিম আহমদ মুন্না (২০)। ছোট্ট একটি ভিডিওতে মানিব্যাগে রাখা মায়ের ছবি দেখিয়ে বলা সেই কথাগুলোই এখন তাঁর মৃত্যুর পর স্বজনদের বুকভাঙা কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দেওয়া ওই পোস্টটিই ছিল তাঁর জীবনের শেষ স্ট্যাটাস। এরপর উন্নত জীবনের স্বপ্নে পাড়ি জমান বিদেশে-সৌদি আরব হয়ে পৌঁছান লিবিয়ায়। সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ‘গেমে’ (ছোট রাবারের নৌযান) চড়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে ওঠে জীবনের শেষ অধ্যায়।
ছয় দিন সাগরে পথ হারিয়ে ভাসতে থাকা একটি নৌকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে ফাহিমসহ অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়। পরে তাঁদের মরদেহ সাগরেই ফেলে দেওয়া হয়।
ফাহিমের বাড়ি সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বোগলাবাজার ইউনিয়নের কবিরনগর গ্রামে। তিনি ছিলেন মা–বাবার একমাত্র সন্তান। বাবা ফয়েজ উদ্দিন দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে সৌদি আরবে প্রবাসী। মা হেলেন আক্তার গৃহিণী। একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর খবর শোনার পর তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন ফাহিম। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের স্বপ্ন পূরণের দায়ও কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্নই তাঁকে ঠেলে দেয় অনিশ্চিত এক যাত্রাপথে।
ফাহিমের চাচা তাইজুল ইসলাম জানান, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে প্রথমে সৌদি আরবে যান ফাহিম। সেখানে অল্প সময় অবস্থানের পর তাঁকে নেওয়া হয় লিবিয়ায়। এরপর ২১ মার্চ তাঁকে অন্যদের সঙ্গে ‘গেমে’ তোলা হয়। নৌকায় মোট ৩৮ জন ছিলেন। পথ হারিয়ে ছয় দিন সাগরে ভেসে থাকার পর একে একে মৃত্যু হয় অনেকের।
২৭ মার্চ গ্রিস উপকূলে পৌঁছালে জীবিতদের উদ্ধার করে একটি ক্যাম্পে নেওয়া হয়। সেখান থেকেই এলাকায় আরেক যুবকের মাধ্যমে ফাহিমের মৃত্যুর খবর পৌঁছায় তাঁর পরিবারে।
স্বজনরা জানান, অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশে পাঠানোর পক্ষে ছিলেন না তাঁরা। কিন্তু ফাহিমের আগ্রহ ও ভবিষ্যতের স্বপ্নের কাছে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করেন পরিবারের সদস্যরা।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মিলন খান বলেন, উন্নত জীবনের আশায় মানব পাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে অনেক তরুণ এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরূপ রতন সিংহ ইতোমধ্যে ফাহিমের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিয়েছেন। এদিকে, শোকে স্তব্ধ মা হেলেন আক্তারের একটাই আকুতি “আমার ছেলের মুখটা আরেকবার দেখতে চাই… লাশটা যেন দেশে আনা হয়।”
ফাহিমের সেই শেষ স্ট্যাটাসের লাইনগুলোই এখন গ্রামজুড়ে উচ্চারিত হচ্ছে একটি সন্তানের মায়ের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা, আর না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার অসহনীয় শোকের প্রতিধ্বনি হয়ে।
কালনী ভিউ ডেস্কঃ 



















