জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, গত ৫৪ বছর দেশের টাকা লুটপাট হয়েছে, কেউ ফেরেস্তা ছিলেন না, কেউ বেশি আর কেউ কম। শুধু ফ্যাসিবাদি সাড়ে ১৫ বছরে দেশ থেকে সাড়ে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এই টাকা ১৮ কোটি মানুষের। পাচারকৃত টাকা আমাদের সবার।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সিলেট আলীয়া মাদরাসা ময়দানে জেলা ও মহানগর জামায়াত আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব তিনি কথা বলেন।
তিনি বলেন, জনগণের এই টাকা যারা চুরি করেছে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের দায়িত্ব দিলে ওদেরকে শান্তিতে থাকতে দেব না। ওরা দুনিয়ার যেখানেই থাকুক না কেন, কোনো জনগণের হক যদি স্বেচ্ছায় দিয়ে দেয়, তবে অভিনন্দিত হবে। কিন্তু যদি ফেরত না দেয়, রাষ্ট্র ওদের মুখের ভেতর হাত ঢুকিয়ে পেটের ভেতর থেকে জনগণের টাকা বের করে নিয়ে আসবে।
তিনি বলেন, আমরা শাহজালালের উত্তরসূরী। তিনি এসেছিলেন অন্যায়, জুলুমতন্ত্র, তৎকালীন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তলোয়ার হাতে। আলহামদুলিল্লাহ, তিনি মজলুমের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, জালিমের বিপক্ষে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন।
বাংলাদেশ গত ৫৪ বছরে জুলুমের শিকারে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আলেম, উলামা, রাজনৈতিক দলের নেতারা, ছাত্র-শিক্ষক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের সদস্যরা, সাধারণ শ্রমিক, কৃষক, কামার-কুমার, তাঁতী, জেলে-কেউই জুলুমের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।
সবচেয়ে মজলুম দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। শুধু আল্লাহ তায়ালার আইনের প্রতিষ্ঠার কথা বলার অপরাধে আমাদের খুন করা হয়েছে। একে একে আমাদের ১১ জন নেতাকে দুনিয়া থেকে বিদায় দেওয়া হয়েছে। এক হাজার সহযোদ্ধা, সহকর্মীকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে। ৫ হাজার সহকর্মীকে জীবনের তরে পঙ্গু করা হয়েছে।
৫০ লাখ ভাই-বোনদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে শিশু থেকে বৃদ্ধ, বারবার জেলে পাঠানো হয়েছে। আমাদের নেতাদের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। দিশেহারা সরকার আমাদের নিবন্ধন বাতিল করেছিল, শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। যখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন চব্বিশের ৫ আগস্ট জাতির জীবনে একটু স্বস্তি দান করলেন, আমরা কোনো মিছিল-মিটিং, উচ্ছ্বাস করলাম না। আমরা আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করার জন্য সেজদায় পড়ে গেলাম, যে আল্লাহ আমাদের বুকের ওপর থেকে জগদ্দল পাথর সরিয়ে দিয়েছেন। এজন্য মহান মনিবের শুকরিয়া আদায় করলাম। বলেছি, আজকের এই মুক্তির বিনিময়ে দল হিসেবে জামায়াত ইসলামী কোনো প্রতিশোধ নেবে না। আমরা কথা রেখেছি, দল হিসেবে কারো ওপর প্রতিশোধ নেইনি।
তিনি বলেন, আমরা বলেছিলাম, যারা খুন হয়েছেন, গুম হয়েছে, যাদের ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে, তাদের অবশ্যই আদালতে গিয়ে ন্যায় বিচার চাওয়ার এবং পাওয়ার অধিকার আছে। যদি এরকম কেউ ন্যায় বিচার চায়, আমরা তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতা করবো। একসাথে একথা হুঁশিয়ারি করেছিলাম, মামলা করতে গিয়ে একজন নিরপরাধ মানুষের নাম তালিকাভুক্ত করা যাবে না। আপনারা শুনে খুশি হবেন, আমরা লাখ লাখ, হাজার, হাজার মামলা দিইনি, সাড়ে সাতশ’র মতো মামলা হয়েছে, ৮টি মামলায় একজন করে আসামি আছে। সেই জায়গায় অনেকে শত শত হাজার হাজার মানুষকে মামলায় ঢুকিয়ে বাণিজ্য করেছে।
সিলেটবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এই যন্ত্রণা থেকে জাতি যখন মুক্তি পেল, আমরা আমাদের পুরোনো সকল বন্ধুদের অনুরোধ করেছিলাম, কেউ যেনো জালিম না হয়। এতোদিন গুম করে চাঁদা আদায় করা হয়েছে, যেসব অন্যায় করা হয়েছে। কিন্তু কেউ কেউ কথা রাখেননি। জনগণ তাদের নিজস্ব বিবেকের আয়নায় বিচার করবে, আমাদের কিছু বলার নেই।
তিনি বলেন, আমি এই সিলেটের সন্তান। এই সিলেটের বুকে বড় হয়েছি। এখানেই শিক্ষাদীক্ষা, লালিত হওয়া, আমার কর্মজীবন, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড। আমি আপনাদের হয়ে এখানে দাঁড়িয়েছি, জামায়াত ইসলামীর আমির হিসেবে নয়। আমি আপনাদেরই স্বজন হয়ে দাঁড়িয়েছি।
তিনি বলেন, আমাদের এই সিলেট নানা বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। সব মিলিয়ে প্রিয় সিলেট বাংলাদেশের সব চাইতে খনিজ সম্পদে ভরপুর। বাংলাদেশের সব চাইতে প্রবাসী নির্ভর সিলেট। দুঃখের বিষয়, এই খনিজ পদার্থের-গ্যাস, তেল-সর্বক্ষেত্রে সিলেটবাসী পাচ্ছে না। সিলেটের গ্যাস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সব জায়গায় নিরবিচ্ছিন্ন পাওয়া যায় না। সিলেটের নদীগুলোকে হত্যা করে মরুভূমি কঙ্কাল বানানো হয়েছে। বর্ষা এলে নদীর দুই কূল ভাঙে, ভাঙ্গনের কবলে পড়ে অসংখ্য মানুষ। আবার শুকনো মৌসুমে সিলেটের নদীতে পানি থাকে না। সিলেটবাসীর জন্য সুপেয় পানি পাওয়া আলাদিনের চেরাগের মতো। এই সমস্ত সংকটে সিলেট ভুগছে। পাশাপাশি ড্রেনেজ অব্যবস্থাপনা নিত্যদিনের সঙ্গী। বৃষ্টি হলে শহর ডুবে যায়। মদ, গাঁজা, সন্ত্রাস, অস্ত্র অস্থির করে রাখে সিলেটকে। এই সমস্ত অপকর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি।
আল্লাহ তায়ালা যদি আমাদেরকে দেশের দায়িত্ব দেন, এক ইঞ্চি মাটির ওপরে কেউ আর চাঁদাবাজির হাত বাড়ানোর সাহস করবে না। আমরা ঘোষণা দিয়েছি, কোনো অফিস-আদালতে ঘুষ নেওয়ার বা খাওয়ার সাহস হবে না। নাগরিকরা শান্তিতে বসবাসের সুযোগ পাবে। রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন ভাতা যথেষ্ট নয়।
জামায়াত আমির বলেন, সিলেটের প্রবাসীরা বাংলাদেশে রেমিটেন্সের বড় একটা অংশ দান করেন। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেন এতদিন পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে যারা ইন্তেকাল করবেন, তাদের লাশ ফিরিয়ে আনতে আর ঠেলাঠেলি হবে না। সরকারি খরচে লাশ দেশে আনা হবে। নদীমাতৃক দেশের নদী এখন মরা। নদী ভাঙন নয়, নদীবান্ধব দেশ হবে। সুরমা-কুশিয়ারা যেন বইয়ের পাতায় নয়, বাস্তবে মিলবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সুনামগঞ্জে ইদুর নাকি বাঁধ কেটে ফেলে, আগামীতে পেটের ইঁদুর আর বাঁধ কাটতে দেওয়া হবে না। জেলেদের নামে জলাশয় কে নেবে, আমরা জানি। এসব রুখে দেওয়া হবে।
চা শ্রমিকদের দায়িত্ব সরকার নেবে ইনশাআল্লাহ। রাজার ছেলে রাজা হবে, এটা আমরা বন্ধ করতে চাই। আমার বিরুদ্ধে মিশাইল মারতে শুরু করেছে, তারা কি জানে না আধুনিক বিশ্বে মিশাইল মারলে এন্টি মিশাইল খেতে হয়।
তিনি বলেন, আমি এই সিলেটের সন্তান। আমাদের একটু এবার সুযোগ দিন। আমরা মালিক হব না, আমরা আপনাদের পাহারা দেব।
পরে তিনি জামায়াত ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের হাতে প্রতীক তুলে দিয়ে তাদেরকে বিজয়ী করার আহবান জানান।
মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি শাহজাহান আলী ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন যৌথ সঞ্চালনায় নির্বাচনী জনসভা পরিচালনা করেন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সিলেট জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা এমরান আলম, খেলাফত মজলিস মহানগর শাখার সভাপতি মাওলানা তাজুল ইসলাম হাসান, মাওলানা ইকবাল হোসাইন, জামায়াতে ইসলামীর সিলেট জেলা শাখার সাবেক নায়েবে আমীর মাওলানা লুকমান আহমদ, জামায়াত নেতা হাফিজ আব্দুল হাই হারুন ও জেলা জামায়াতের আমীর ও সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানও জনসভায় বক্তব্য রাখেন।
কালনী ভিউ ডেস্কঃ 
















