সকাল ঠিক এগারটার একটু পর আমার ম্যাসেঞ্জারে একটা ম্যাসেজ আসলো। এরকম ম্যাসেজ আদান প্রদান বেশ ক’জনের সাথে নিয়মিত হয়ে থাকে। ভাবলাম অন্যান্য দিনের ম্যাসেজের মত সেরকমই কিছু একটা হবে হয়তো।
কিছুক্ষণ পর ম্যাসেজটা খোলে পড়তেই একটা খবর অন্তরটা চিপা দিয়ে উঠলো। ডক্টর শফিউদ্দিন আহমদ স্যার মারা গেছেন। আমার সারা শরীর মন জুড়ে ছাত্রজীবনের সেই সোনালী সময়ে পাওয়া শিক্ষকের চেহারা মানসপটে ভেসে উঠলো।
১৯৯৩-১৯৯৪ শিক্ষাবর্ষে সিলেট এর মুরারি চাঁদ কলেজে বাংলা বিভাগে স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পরই বিভাগীয় প্রধান হিসেবে ডক্টর শফিউদ্দিন আহমদ যোগদান করলেন।
পাজামা পাঞ্জাবী পড়া অনেকটা দিঘলদেহী, চোখে পাওয়ার ওয়ালা খয়েরি ফ্রেমের চশমা পড়া গম্ভীর স্বভাবের একজন আন্তরিক শিক্ষার্থী অন্তপ্রাণ শিক্ষক। মাথার চুল খুব একটা না থাকলেও পিছনে ঘাড়ের উপর হালকা লম্বা চুল কিঞ্চিত ঝুলে আছে।
ডক্টর শফিউদ্দিন আহমদ স্যারের ক্লাস ছিল সপ্তাহে একটা। এই একটা ক্লাস করার জন্য অনন্তকালের মত অপেক্ষা করতাম সারা সপ্তাহ জুড়ে। মনে হতো যেন, একবার হারিকেনে কেরোসিন ভরে নিলে পুরো একটা সপ্তাহ জ্বলবে। স্যারের ক্লাসটা ছিল ঠিক সেরকম। পুরো সময় জুড়ে মন্ত্রমুগ্ধের মত ক্লাস মনোযোগসহকারে করতাম এবং উৎসাহ উদ্দীপনামূলক কথার মাধ্যমে নিজের মধ্যে অন্যরকম একটা আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে পড়াটা টের পেতাম। পুরো ক্লাসের সময় ছিল একটা অন্যরকম ভ্রমণ। একজন শিক্ষক পাঠদানের মাধ্যমে তাঁর শিক্ষার্থীকে নিয়ে যে স্বপ্নের জগতে ভ্রমণ করতে পারেন, সেটা ডক্টর শফিউদ্দিন আহদ স্যারের ক্লাস যারা করেছেন তারা বুঝতে পারবেন।
শিক্ষার্থীদেরকে রাজনীতির লেজুরভিত্তির বিরুদ্ধে স্যার ছিলেন খুবই সুচ্চার। যারা নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য শিক্ষার্থীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয় তাদেরকে তিনি বিভিন্ন প্রোগ্রামে বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে তুলোধুনো করতেন। স্যারের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট,,,, ” আমার ছেলেরা তো খারাপ না, তাদেরকে খারাপ কাজে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। দোষ আমার ছেলেদের না , যারা তাদেরকে খারাপ পথে পরিচালিত করছে প্রকৃত দোষী তারা,,,” স্যারে এসব বক্তব্য আমার জানা মতে বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে অস্ত্র ফেলে , বাজে আড্ডা ফেলে পড়ালেখার দিকে ধাবিত করেছিল।
ডক্টর শফিউদ্দিন আহমদ স্যার শিক্ষার্থীর মনে প্রভাব বিস্তার করার মত কিছু কথা প্রায়ই বলতেন। যেমন- “তোমাদের এক হাতে থাকবে বই, আরেক হাতে থাকবে হাতুড়ি। বই পড়ে জ্ঞানার্জন করবে, আর হাতুড়ি দিয়ে জড়াজীর্ণতাকে ভেঙ্গে ফেলে দিবে । বই থেকে অর্জিত জ্ঞান দিয়ে নতুন এবং সুন্দর সমাজ গড়ে তুলবে।”
দেশের প্রতি গভীর মমত্ববোধ যেমন ছিল, তেমনি জ্ঞানার্জনের দিকেও তিনি আমাদেরকে ধাবিত করতেন হ্যমিলনের বাঁশিওয়ালার মত।
তিনি বলতেন – “তোমাদের পা থাকবে দেশের মাটিতে, আর চোখ থাকবে আকাশের দিকে। সারা বিশ্ব চষে বেড়াবে জ্ঞানার্জনের নেশায় , কিন্তু স্বদেশকে কখনই ভুলা যাবে না।” দেশের মাটিকে কখনই পরিত্যাগ করা যাবে না। দেশের মাটি,পানি, সমাজ সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে সারা বিশ্বে জ্ঞানার্জনের জন্য চষে বেড়াতে তিনি শিক্ষার্থীদেরকে উৎসাহিত করতেন। দেশকে যেন সবসময় বুকে আগলে ধরে রাখতে পারি, সেটাই তিনি আমাদের মন মগজে ঢুকিয়ে দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন।
তাঁর একটা কথা চরমভাবেই সতি্য ছিল । তিনি বলতেন – “আমি তো তোমাদেরকে পড়াতে পারব না , পড়ানোর দায়িত্বও আমার না। তবে, তোমাদের মগজকে পড়ার জন্য আন্দোলিত করে দেয়ার কাজটাই আমার। তোমার মন মগজকে আমি এমনভাবে তৈরি করে দিব , যাতে তুমি পড়ালেখা করার জন্য পাগল হয়ে উঠো। ”
সত্যিকার অর্থেই শিক্ষকের আসল কাজটাই হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মাথা পড়ার জন্য আউলাইয়ে দেয়া। ডক্টর শফিউদ্দিন স্যার ঠিক সে কাজটাই করতেন । তাঁর ক্লাস শেষ হলে মনে হতো , আজ থেকে আমিও হতে চাই ডক্টর শফিউদ্দিন আহমদ।
বাসায় ফিরে এসে জামা-কাপড় পরিবর্তন করে বই এর একপৃষ্ঠা থেকে অন্য পৃষ্ঠায় বিরামহীনভাবে ভ্রমণ করতাম। দিন রাতের মধ্যে পার্থক্য তেমন থাকতোই না। পরবর্তী ক্লাসের আগ পর্যন্ত সত্যিকার অর্থেই অনেকটা বিরামহীন পড়ালেখা চলতে থাকতো।
অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষাটাও ডক্টর শফিউদ্দিন আহমদ স্যার চমৎকারভাবে শিক্ষার্থীর মগজে সফলভাবে ঢুকিয়ে দিতেন। তিনি একটা উদ্ধৃতি প্রায়ই দিতেন ” নানা বরণ গাভী তার একই রকম দুধ/ জগত ভরমিয়া দেখি সবাই একই মায়ে পুত,,” ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যে মানুষ এবং আদি উৎস যে একটাই, সেটাই তিনি শিক্ষার্থীর কাছে চমৎকার প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করে দীক্ষিত করতেন।
মাঝে মাঝে সন্ধ্যার পর ডক্টর শফিউদ্দিন আহমদ স্যারের সিলেটের জিন্দাবাজারস্ত বাসায় যেতাম। প্রচুর লোকজন সেখানে উপস্থিত থাকতেন স্যারের জ্ঞানগর্ভ কথা শুনার জন্য। জ্ঞান বিজ্ঞানের আলাপ ছাড়া কোন কথাই ছিল না। তাঁর বাসায় অপরিচিত কেউ গেলে বুঝতেই পারবে না যে, এটা একজন অধ্যাপকের বাসা। লোক সমাগম দেখলে বুঝা যাবে একজন জনপ্রতিনিধির বাসা এটা। ড্রয়িং রুমের আলমারি , জানালার পাশে বই আর বই। ড্রয়িং রুমে ঢুকার সাথে সাথেই মনে হতো একটা জ্ঞান বিজ্ঞানের স্টোর রুমে ঢুকেছি। স্যারের আলাপচারিতা শুনে বের হওয়ার সাথে সাথেই বুঝতে পারতাম নিজের জ্ঞান জগতের পরিবর্তন।
শিক্ষার্থীদের সকল ধরনের দাবি দাওয়ার কথা খুবই আন্তরিকতার সাথে মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। একদিন আমাদের বন্ধু বাবুল একটা দাবি নিয়ে স্যারের কাছে গেল। তার বক্তব্য ছিল সেমিনার রুমটা বন্ধ থাকায় আমরা বই পড়তে পারতেছি না। ওটা খোলার ব্যবস্থা করলে খুবই উপকৃত হতাম।
লেখক:
মোহাম্মদ জাহির মিয়া তালুকদার
ইন্সট্রাক্টর উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টার, হবিগঞ্জ সদর, হবিগঞ্জ।
মোহাম্মদ জাহির মিয়া তালুকদার 

















