তফসিল ঘোষণা না হলেও সুনামগঞ্জের দিরাই পৌরসভা নির্বাচন ঘিরে শুরু হয়েছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ। দলীয় সমর্থন পেতে যোগাযোগ, নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং স্থানীয়ভাবে সমর্থন গড়ে তোলার চেষ্টায় সরব হয়ে উঠেছে পৌর এলাকার রাজনৈতিক অঙ্গন। এর মধ্যে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী কে হচ্ছেন, তা নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে।
এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও দল সমর্থিত প্রার্থীরা মাঠে থাকবেন। ফলে বিএনপির সমর্থন কার ভাগ্যে জুটছে এবং সমর্থন না পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে কারা স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তা নিয়েই দিরাই পৌরবাসীর আগ্রহ বাড়ছে।
স্থানীয় বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় সমর্থন পেতে অন্তত চারজন সম্ভাব্য প্রার্থী সক্রিয় রয়েছেন। তারা হলেন, দিরাই পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন চৌধুরী, সাবেক ছাত্রদল নেতা আবুল হাসনাত রিপন, রুদ্র মিজান এবং দিরাই পৌরসভার সাবেক মেয়র ও পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত হাজী আহমদ মিয়ার ছেলে আজমল হোসেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দিরাই বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের ভাষ্য, দিরাই বিএনপিতে বর্তমানে দুটি পৃথক বলয়ের প্রভাব রয়েছে। একদিকে রয়েছেন সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী। অন্যদিকে রয়েছেন বিএনপি নেতা তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল ও মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক।
পৌরসভা নির্বাচন সামনে রেখে উভয় পক্ষই নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এমপির পছন্দ রুদ্র মিজান
সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজনদের সূত্রের দাবি, পৌরসভা নির্বাচনে রুদ্র মিজানকে বিএনপির সমর্থন পাইয়ে দিতে তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। রুদ্র মিজান বর্তমানে নাছির উদ্দিন চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, ছাত্রদলের রাজনীতি থেকেই নাছির উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে রুদ্র মিজানের রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৫ সালে পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরে নাছির উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর সৎ ভাইদের দূরত্ব তৈরি হলে রুদ্র মিজান তাঁর পাশে অবস্থান নেন। এরপর থেকে নাছির চৌধুরীর প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে তাঁকে সক্রিয় দেখা গেছে। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নাছির উদ্দিন চৌধুরীর প্রধান এজেন্টের দায়িত্ব পালন করেন রুদ্র মিজান।
পাল্টা বলয়ে আলোচনায় ইকবাল
অন্যদিকে নাছির উদ্দিন চৌধুরীর বিরোধী হিসেবে পরিচিত বলয় থেকেও একাধিক প্রার্থীর নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে এগিয়ে রয়েছেন দিরাই পৌর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন চৌধুরী। এর আগের পৌরসভা নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। তবে ওই নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন।
দিরাই পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রুদ্র মিজান ও ইকবাল হোসেন চৌধুরী বিএনপির সমর্থন পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন। ইকবাল-এর পাল্লাভারী মনে হলেও রুদ্র মিজানকে দলীয় প্রার্থী করতে সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো কারণে রুদ্র মিজান দলীয় সমর্থন না পেলে আজমল হোসেনকে সমর্থন দিতে পারেন এমপি। আর ইকবাল দলীয় সমর্থন না পেলে আবুল হাসনাত রিপনকে সমর্থন দিতে পারে এমপি-বিরোধী পক্ষ। আজমল ও রিপন দলীয় সমর্থন না পেলেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দিরাই পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক সর্দার বলেন, কিছু দিনের মধ্যে আমাদের নেতা নাছির চৌধুরী দিরাই আসবেন। তখন প্রার্থীর বিষয়ে আলোচনা হবে। দল যাকে সমর্থন দেবে, আমরা তাঁর বিজয় নিশ্চিত করতে কাজ করব।
দিরাই পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান বলেন, দলের দুঃসময়ে যারা নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন এবং সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন, তাদের মধ্য থেকেই প্রার্থী হওয়া উচিত। কোনো নেতার আত্মীয় বা ব্যক্তিগত সহকারীকে দলের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
জামায়াত-এনসিপিতে এখনো প্রার্থী নিয়ে আলোচনা নেই
দিরাই পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম এখনো প্রকাশ্যে জোরালোভাবে আলোচনায় আসেনি। তবে নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসবে, ততই নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীদের নির্বাচনী তৎপরতাও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। স্থানীয় পর্যায়ে সাবেক মেয়র মোশাররফ মিয়া ও বিশ্বজিৎ রায়ের নাম আলোচনায় রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের পদ-পদবিতে ছিলেন না এমন কাউকে সামনে রেখে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও দলটির স্থানীয় পর্যায়ে বিবেচনায় রয়েছে বলে একাধিক সূত্রের দাবি। একক প্রার্থী নির্ধারণের লক্ষ্যে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে বলেও জানা গেছে।
ভোটার ২৫ হাজার ৪৬৭
দিরাই পৌরসভায় মোট ভোটার ২৫ হাজার ৪৬৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১২ হাজার ৬৩৯ এবং নারী ভোটার ১২ হাজার ৮২৮ জন। পৌরসভায় ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১২টি। মোট ভোটকক্ষ ৪৯টি। এর মধ্যে স্থায়ী ভোটকক্ষ ৪৬টি এবং অস্থায়ী তিনটি।
সুনামগঞ্জ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শুকুর মাহমুদ মিঞা বলেন, বর্তমানে আমাদের প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নির্বাচন চলাকালে পুলিশ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সার্বিক সহযোগিতায় একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সুন্দর নির্বাচন সম্পন্ন করতে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
তফসিল ঘোষণা ও দলীয় সিদ্ধান্তের পর দিরাই পৌরসভা নির্বাচনের মাঠের সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
মুজাহিদ সর্দার তালহা 
















