লন্ডন ১২:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য জীবন: গৃহবধূ থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে তার জন্ম। তার বাবা ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে দেশভাগের পর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে চলে আসেন। তাদের আদি বাড়ি ফেনীতে। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন।তিনি ছিলেন নিতান্ত এক গৃহবধূ, কিন্তু তার সংগ্রাম ও আপসহীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাকে দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী করেছে।১৯৮১ সালে ৩০ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে বিপথগামী সেনাসদস্যরা তখন দুই শিশু সন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে নিয়ে ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তখন বিপর্যস্ত এবং দিশেহারা। জিয়াউর রহমান পরবর্তী দলের হাল কে ধরবেন সেটি নিয়ে নানা আলোচনা চলতে থাকে। বিএনপি নেতারা তখন দ্বিধাগ্রস্ত এবং তাদের মধ্যে কোন্দলও ছিল প্রবল।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর ভাইস-প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিলেন। সাত্তারের বয়স তখন আনুমানিক ৭৮ বছর। বৃদ্ধ এবং দুর্বল চিত্তের ব্যক্তি হিসেবে সাত্তার পছন্দ করত তৎকালীন সেনা কর্মকর্তারা। তখন দলের একটি অংশ চেয়েছিল কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্বের কাঠামো ঠিক করা হোক। কিন্তু অপর আরেকটি অংশ, যারা রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের সরকারে ছিলেন, তারা সেটির বিরোধিতা করেন।প্রয়াত বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ তার ‘চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা’ বইতে লিখেছেন, সামরিক এবং শাসকচক্রের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় ছিল খালেদা জিয়াকে নিয়ে। কারণ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবার জন্য খালেদা জিয়াই সে সময় সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হতে পারতেন। কিন্তু তড়িঘড়ি করে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য আব্দুস সাত্তারের মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হলো। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদ চেয়েছিলেন, মি. সাত্তার প্রেসিডেন্ট হোক। বিষয়টি নিয়ে তখনকার বিএনপিতে মতভেদ দেখা দেয়। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেনাপ্রধানের ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ হয়েছে।মওদুদ আহমদ লিখেছেন, “বেগম জিয়া যদি প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চাইতেন, তাহলে অন্য কারো প্রার্থী হওয়ার তখন আর প্রশ্ন উঠতো না।”সাংবাদিক শফিক রেহমান তাঁর ‘সংগ্রামী নেত্রী খালেদা জিয়া’ শীর্ষক লেখায় তাকে বর্ণনা করেছেন এভাবে, “জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হলেও লাজুক গৃহবধূরূপে তার দুই ছেলে তারেক রহমান (পিনো) এবং আরাফাত রহমান (কোকো)-কে নিয়ে সাংসারিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন।”বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের বার্ধক্য এবং দল পরিচালনা নিয়ে অসন্তোষের কারণে তৎকালীন বিএনপির একাংশ খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আনার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু রাজনীতির প্রতি খালেদা জিয়ার তেমন কোন আগ্রহ ছিল না। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে এর কয়েকটি কারণ ছিল। প্রথমত; জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তাঁর মনে গভীর দাগ কেটেছিল এবং তিনি মানসিকভাবে সে ধকল কাটিয়ে উঠতে পারছিলেন না। তাছাড়া রাজনৈতিক ভাগ্য তাকে কোথায় টেনে নিয়ে যায় সেটি নিয়েও হতো খালেদা জিয়ার মনে চিন্তা ছিল।সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ ২০১৯ সালের শুরুর দিকে বিবিসি বাংলাকে বলেন, খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) আকবর হোসেন, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম শিশু এবং একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এছাড়া নজরুল ইসলাম খান এবং জমির উদ্দিন সরকারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে উল্লেখ করেন মাহফুজউল্লাহ। কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন।

নুরুল ইসলাম শিশু ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহচর। এছাড়া একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের মন্ত্রী এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন।মওদুদ আহমদ তাঁর বইয়ে দাবি করেন, খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে সক্রিয় করার ক্ষেত্রে যাদের অবদান ছিল তিনি তাদের মধ্যে একজন। উনিশশো বিরাশি সালের ৭ নভেম্বর খালেদা জিয়া যখন জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলে গিয়ে প্রথম রাজনৈতিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেন সেটির পেছনে মি. আহমদের ভূমিকা ছিল বলে তিনি নিজে উল্লেখ করেন।বিএনপি’র ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৮২ সালের তেসরা জানুয়ারি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে খালেদা জিয়া আত্মপ্রকাশ করেন। সেদিন তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেন। একই বছর ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে খালেদা জিয়া প্রথম বক্তব্য রাখেন।’বিএনপি: সময়-অসময়’ বইয়ে লেখক মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন বিএনপিতে যোগ দেবার পর থেকে খালেদা জিয়া বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া শুরু করেন। তিনি লিখেছেন, ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদের নতুন ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার এবং প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের সাথে খালেদা জিয়াও উপস্থিত ছিলেন।উনিশশো বিরাশি সালের ২১শে জানুয়ারি বিএনপি’র চেয়ারম্যান নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। দলের মধ্যে তখন এনিয়ে বিভক্তি। দলের তরুণ অংশ চেয়েছিল খালেদা জিয়া দলীয় প্রধান হোক। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে বিএনপি’র প্রধান হিসেবে দেখেতে আগ্রহী ছিল তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ। বিএনপির চেয়ারম্যান হবার জন্য একইসাথে প্রার্থী হয়েছিলেন খালেদা জিয়া এবং রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার।বিএনপির ওয়েবসাইটে তখনকার ঘটনা বর্ণনা তুলে ধরে বলা হয়েছে, “এর ফলে এক বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। বিচারপতি সাত্তার দুবার বেগম খালেদা জিয়ার বাসায় যান। বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে তরুণ নেতৃত্বের মনোভাবে কথা জানান। এসময় বিচারপতি সাত্তার বেগম খালেদা জিয়াকে দলের সহ-সভাপতির পদ এবং দেশের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান। কিন্তু বেগম জিয়া ব্যক্তিগত কারণে তা গ্রহণ করেননি। অবশেষে বিচারপতি সাত্তারের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর বেগম খালেদা জিয়া চেয়ারম্যান পদ থেকে তাঁর প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেন।”উনিশশো বিরাশি সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। তখন রাজনীতিতে সাত্তারের আর কোন মূল্য থাকেনি। তাঁর বার্ধক্য, অসুস্থতা এবং নিষ্ক্রিয়তার কারণে দল থেকে তিনি আড়ালে পড়ে যান। সাত্তার আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান থাকলেও দল পরিচালনায় খালেদা জিয়ার প্রভাব বাড়তে থাকে।উনিশশো তিরাশি সালের মার্চ মাসে খালেদা জিয়া দলের সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হন এবং এপ্রিল মাসের প্রথমে বিএনপির এক বর্ধিত সভায় তিনি ভাষণ দেন। কিন্তু তৎকালীন বিএনপির কিছু নেতা সেটি পছন্দ করেননি। বিএনপির সেই অংশটি ভিন্ন আরেকটি জায়গায় বৈঠকের আয়োজন করে।সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের কয়েকমাস পরেই খালেদা জিয়া দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। এ সময় এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠেন তিনি। এরপর ১৯৮৪ সালের ১০ই মে খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।মওদুদ আহমদ লিখেছেন, খালেদা জিয়া দলের চেয়ারম্যান হোন এটি সামরিক নেতারা, দুই গোয়েন্দা বিভাগ এবং মন্ত্রীসভার দুই গ্রুপ – কেউ চায়নি। প্রভুদের এবং নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজ অনেকটা জোর করেই বিচারপতি সাত্তারকে দিয়ে মনোনয়নপত্রে সই করান।এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন ধীরে ধীরে জোরালো হচ্ছিল তখন বিএনপির বাইরে অন্য রাজনৈতিক দল থেকে খালেদা জিয়াকে দলের নেতৃত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। এক্ষেত্রে হায়দার আকবর খান রনো এবং রাশেদ খান মেনন ছিলেন অন্যতম। খালেদা জিয়ার সাথে আলোচনার জন্য তারা দুইজন তাঁর তৎকালীন ক্যান্টনমেন্টের বাসায় গিয়েছিলেন। মি. রনো তাঁর আত্মজীবনী ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ বইতে একথা তুলে ধরেছেন।খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে মি. রনো তাঁর বইতে লিখেছেন, “আমরা খালেদা জিয়ার কাছে প্রস্তাব করলাম, আপনি রাজনীতিতে আসুন, বিএনপির হাল ধরুন, এক্ষেত্রে এরশাদের বিরুদ্ধে লড়ব। এরশাদ সম্পর্কে তার ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু সরাসরি রাজনীতি করবেন কী-না সে সম্পর্কে কিছু বললেন না। দেখলাম, তিনি স্বল্পভাষী, তবে আমাদের কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। কোন কথা ঠিক মতো বুঝতে না পারলে, প্রশ্ন করে ভালো করে বুঝে নিচ্ছিলেন। সবশেষে তিনি বললেন, ভেবে দেখব।

“উনিশশো আশির দশকে জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে দেশজুড়ে খালেদা জিয়ার ব্যাপক পরিচিত গড়ে উঠে। জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে বিএনপি জয়লাভ করে। রাজনীতিতে আসার ১০ বছরের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁকে কয়েকবার আটক করা হলেও আন্দোলন থেকে সরে যাননি বিএনপি চেয়ারপারসন।খালেদা জিয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনে যতগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তার সবগুলোতেই জয়লাভ করেছেন। খালেদা জিয়ার শাসন আমল, ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ — এই দুইভাগে ভাগ করেন অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক।

ট্যাগ:
জনপ্রিয়

‘বট’ আইডির কুরুচিপূর্ণ লেখালেখি-ছাত্রদল নেতা মুর্শেদের পক্ষে দাঁড়ালেন বিএনপি নেতারা

খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য জীবন: গৃহবধূ থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশের সময়: ০৮:৫৩:০৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে তার জন্ম। তার বাবা ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে দেশভাগের পর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে চলে আসেন। তাদের আদি বাড়ি ফেনীতে। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন।তিনি ছিলেন নিতান্ত এক গৃহবধূ, কিন্তু তার সংগ্রাম ও আপসহীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাকে দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী করেছে।১৯৮১ সালে ৩০ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে বিপথগামী সেনাসদস্যরা তখন দুই শিশু সন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে নিয়ে ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তখন বিপর্যস্ত এবং দিশেহারা। জিয়াউর রহমান পরবর্তী দলের হাল কে ধরবেন সেটি নিয়ে নানা আলোচনা চলতে থাকে। বিএনপি নেতারা তখন দ্বিধাগ্রস্ত এবং তাদের মধ্যে কোন্দলও ছিল প্রবল।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর ভাইস-প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিলেন। সাত্তারের বয়স তখন আনুমানিক ৭৮ বছর। বৃদ্ধ এবং দুর্বল চিত্তের ব্যক্তি হিসেবে সাত্তার পছন্দ করত তৎকালীন সেনা কর্মকর্তারা। তখন দলের একটি অংশ চেয়েছিল কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্বের কাঠামো ঠিক করা হোক। কিন্তু অপর আরেকটি অংশ, যারা রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের সরকারে ছিলেন, তারা সেটির বিরোধিতা করেন।প্রয়াত বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ তার ‘চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা’ বইতে লিখেছেন, সামরিক এবং শাসকচক্রের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় ছিল খালেদা জিয়াকে নিয়ে। কারণ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবার জন্য খালেদা জিয়াই সে সময় সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হতে পারতেন। কিন্তু তড়িঘড়ি করে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য আব্দুস সাত্তারের মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হলো। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদ চেয়েছিলেন, মি. সাত্তার প্রেসিডেন্ট হোক। বিষয়টি নিয়ে তখনকার বিএনপিতে মতভেদ দেখা দেয়। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেনাপ্রধানের ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ হয়েছে।মওদুদ আহমদ লিখেছেন, “বেগম জিয়া যদি প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চাইতেন, তাহলে অন্য কারো প্রার্থী হওয়ার তখন আর প্রশ্ন উঠতো না।”সাংবাদিক শফিক রেহমান তাঁর ‘সংগ্রামী নেত্রী খালেদা জিয়া’ শীর্ষক লেখায় তাকে বর্ণনা করেছেন এভাবে, “জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হলেও লাজুক গৃহবধূরূপে তার দুই ছেলে তারেক রহমান (পিনো) এবং আরাফাত রহমান (কোকো)-কে নিয়ে সাংসারিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন।”বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের বার্ধক্য এবং দল পরিচালনা নিয়ে অসন্তোষের কারণে তৎকালীন বিএনপির একাংশ খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আনার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু রাজনীতির প্রতি খালেদা জিয়ার তেমন কোন আগ্রহ ছিল না। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে এর কয়েকটি কারণ ছিল। প্রথমত; জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তাঁর মনে গভীর দাগ কেটেছিল এবং তিনি মানসিকভাবে সে ধকল কাটিয়ে উঠতে পারছিলেন না। তাছাড়া রাজনৈতিক ভাগ্য তাকে কোথায় টেনে নিয়ে যায় সেটি নিয়েও হতো খালেদা জিয়ার মনে চিন্তা ছিল।সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ ২০১৯ সালের শুরুর দিকে বিবিসি বাংলাকে বলেন, খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) আকবর হোসেন, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম শিশু এবং একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এছাড়া নজরুল ইসলাম খান এবং জমির উদ্দিন সরকারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে উল্লেখ করেন মাহফুজউল্লাহ। কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন।

নুরুল ইসলাম শিশু ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহচর। এছাড়া একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের মন্ত্রী এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন।মওদুদ আহমদ তাঁর বইয়ে দাবি করেন, খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে সক্রিয় করার ক্ষেত্রে যাদের অবদান ছিল তিনি তাদের মধ্যে একজন। উনিশশো বিরাশি সালের ৭ নভেম্বর খালেদা জিয়া যখন জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলে গিয়ে প্রথম রাজনৈতিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেন সেটির পেছনে মি. আহমদের ভূমিকা ছিল বলে তিনি নিজে উল্লেখ করেন।বিএনপি’র ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৮২ সালের তেসরা জানুয়ারি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে খালেদা জিয়া আত্মপ্রকাশ করেন। সেদিন তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেন। একই বছর ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে খালেদা জিয়া প্রথম বক্তব্য রাখেন।’বিএনপি: সময়-অসময়’ বইয়ে লেখক মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন বিএনপিতে যোগ দেবার পর থেকে খালেদা জিয়া বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া শুরু করেন। তিনি লিখেছেন, ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদের নতুন ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার এবং প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের সাথে খালেদা জিয়াও উপস্থিত ছিলেন।উনিশশো বিরাশি সালের ২১শে জানুয়ারি বিএনপি’র চেয়ারম্যান নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। দলের মধ্যে তখন এনিয়ে বিভক্তি। দলের তরুণ অংশ চেয়েছিল খালেদা জিয়া দলীয় প্রধান হোক। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে বিএনপি’র প্রধান হিসেবে দেখেতে আগ্রহী ছিল তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ। বিএনপির চেয়ারম্যান হবার জন্য একইসাথে প্রার্থী হয়েছিলেন খালেদা জিয়া এবং রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার।বিএনপির ওয়েবসাইটে তখনকার ঘটনা বর্ণনা তুলে ধরে বলা হয়েছে, “এর ফলে এক বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। বিচারপতি সাত্তার দুবার বেগম খালেদা জিয়ার বাসায় যান। বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে তরুণ নেতৃত্বের মনোভাবে কথা জানান। এসময় বিচারপতি সাত্তার বেগম খালেদা জিয়াকে দলের সহ-সভাপতির পদ এবং দেশের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান। কিন্তু বেগম জিয়া ব্যক্তিগত কারণে তা গ্রহণ করেননি। অবশেষে বিচারপতি সাত্তারের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর বেগম খালেদা জিয়া চেয়ারম্যান পদ থেকে তাঁর প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেন।”উনিশশো বিরাশি সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। তখন রাজনীতিতে সাত্তারের আর কোন মূল্য থাকেনি। তাঁর বার্ধক্য, অসুস্থতা এবং নিষ্ক্রিয়তার কারণে দল থেকে তিনি আড়ালে পড়ে যান। সাত্তার আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান থাকলেও দল পরিচালনায় খালেদা জিয়ার প্রভাব বাড়তে থাকে।উনিশশো তিরাশি সালের মার্চ মাসে খালেদা জিয়া দলের সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হন এবং এপ্রিল মাসের প্রথমে বিএনপির এক বর্ধিত সভায় তিনি ভাষণ দেন। কিন্তু তৎকালীন বিএনপির কিছু নেতা সেটি পছন্দ করেননি। বিএনপির সেই অংশটি ভিন্ন আরেকটি জায়গায় বৈঠকের আয়োজন করে।সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের কয়েকমাস পরেই খালেদা জিয়া দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। এ সময় এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠেন তিনি। এরপর ১৯৮৪ সালের ১০ই মে খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।মওদুদ আহমদ লিখেছেন, খালেদা জিয়া দলের চেয়ারম্যান হোন এটি সামরিক নেতারা, দুই গোয়েন্দা বিভাগ এবং মন্ত্রীসভার দুই গ্রুপ – কেউ চায়নি। প্রভুদের এবং নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজ অনেকটা জোর করেই বিচারপতি সাত্তারকে দিয়ে মনোনয়নপত্রে সই করান।এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন ধীরে ধীরে জোরালো হচ্ছিল তখন বিএনপির বাইরে অন্য রাজনৈতিক দল থেকে খালেদা জিয়াকে দলের নেতৃত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। এক্ষেত্রে হায়দার আকবর খান রনো এবং রাশেদ খান মেনন ছিলেন অন্যতম। খালেদা জিয়ার সাথে আলোচনার জন্য তারা দুইজন তাঁর তৎকালীন ক্যান্টনমেন্টের বাসায় গিয়েছিলেন। মি. রনো তাঁর আত্মজীবনী ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ বইতে একথা তুলে ধরেছেন।খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে মি. রনো তাঁর বইতে লিখেছেন, “আমরা খালেদা জিয়ার কাছে প্রস্তাব করলাম, আপনি রাজনীতিতে আসুন, বিএনপির হাল ধরুন, এক্ষেত্রে এরশাদের বিরুদ্ধে লড়ব। এরশাদ সম্পর্কে তার ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু সরাসরি রাজনীতি করবেন কী-না সে সম্পর্কে কিছু বললেন না। দেখলাম, তিনি স্বল্পভাষী, তবে আমাদের কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। কোন কথা ঠিক মতো বুঝতে না পারলে, প্রশ্ন করে ভালো করে বুঝে নিচ্ছিলেন। সবশেষে তিনি বললেন, ভেবে দেখব।

“উনিশশো আশির দশকে জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে দেশজুড়ে খালেদা জিয়ার ব্যাপক পরিচিত গড়ে উঠে। জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে বিএনপি জয়লাভ করে। রাজনীতিতে আসার ১০ বছরের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁকে কয়েকবার আটক করা হলেও আন্দোলন থেকে সরে যাননি বিএনপি চেয়ারপারসন।খালেদা জিয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনে যতগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তার সবগুলোতেই জয়লাভ করেছেন। খালেদা জিয়ার শাসন আমল, ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ — এই দুইভাগে ভাগ করেন অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক।