হাওরাঞ্চলের কৃষক শুধু ফসল ফলান না, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তিও গড়ে তোলেন। সেই কৃষক যখন অতিবৃষ্টি ও বন্যায় সর্বস্ব হারিয়ে সরকারি সহায়তার আশায় থাকেন, তখন সেই সহায়তার তালিকায় অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
দিরাইয়ে কৃষি সহায়তার তালিকা নিয়ে যে অভিযোগগুলো একের পর এক সামনে আসছে, তা আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না। প্রথমে করিমপুর ইউনিয়নে তালিকা সংশোধন করতে হয়েছে। পরে জগদল ইউনিয়নের কৃষকরা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। সর্বশেষ করিমপুর ইউনিয়নের চানপুর গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরাও ইউএনও বরাবরে অভিযোগ করে দাবি করেছেন, তালিকায় অক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং এলাকায় বসবাস করেন না এমন লোকজনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, অথচ প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অনেকে বাদ পড়েছেন।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, তালিকা প্রণয়নের কাজে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা ছিল বলে জানা গেছে। মাঠপর্যায়ে অনেক কৃষকের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং স্বজনপ্রীতির প্রভাব তালিকা তৈরিতে প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পরিবর্তে প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠজনরা সুবিধাভোগীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে হবে, তবে একের পর এক ইউনিয়নে একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসা পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রশ্ন হলো, মাঠপর্যায়ে তালিকা তৈরির দায়িত্বে যারা ছিলেন, তারা কীভাবে এমন নাম অন্তর্ভুক্ত করলেন? যদি অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি শুধু প্রশাসনিক ভুল নয়, এটি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অধিকার হরণের শামিল। কারণ একজন অযোগ্য ব্যক্তি তালিকায় জায়গা পাওয়ার অর্থ হলো একজন প্রকৃত কৃষক তার ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হওয়া।
সরকার কৃষকের পাশে দাঁড়াতে চায়। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত সহায়তা কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যই হলো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া। কিন্তু সেই সহায়তা যদি প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে না পৌঁছে, তাহলে পুরো কর্মসূচির উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এখন প্রয়োজন অভিযোগগুলোকে হালকাভাবে না দেখে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা। ইউনিয়নভিত্তিক তালিকা পুনঃযাচাই, বিতর্কিত নামগুলো যাচাই-বাছাই এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে প্রশাসনকে স্বচ্ছতার প্রমাণ দিতে হবে। একই সঙ্গে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দিয়ে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন কিংবা অনিয়মে জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কৃষকের দুর্দশাকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার কিংবা স্বজনপ্রীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই। যে সহায়তা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ঘরে পৌঁছানোর কথা, তা যদি দলীয়করণ বা প্রভাবশালীদের স্বার্থরক্ষার মাধ্যম হয়ে ওঠে, তবে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, কৃষকের সঙ্গে নির্মম অন্যায়ও বটে। প্রশাসনের দায়িত্ব এখন শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়, বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকার নিশ্চিত করা।
হাওরের কৃষক আজ জানতে চান- সরকারি সহায়তা কি সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য, নাকি প্রভাবশালী ও সুবিধাভোগীদের জন্য? এই প্রশ্নের জবাব এখন প্রশাসনকেই দিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে।
কৃষকের হক নিয়ে কোনো ধরনের আপস নয়। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাই হতে হবে প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কারণ কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, কৃষি বাঁচলে বাঁচবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা।
মুজাহিদ সর্দার তালহা
সম্পাদক ও প্রকাশক
কালনী ভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম
সম্পাদকীয় 


















