সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের বিএনপির রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। দিরাই উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা, নেতৃত্বের সমন্বয় এবং উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকিকে কেন্দ্র করে এবার সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরীর বলয়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেই বিরোধ দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি নাছির উদ্দিন চৌধুরী সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকি করার জন্য একটি সমন্বয় কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিলে এ বিরোধ আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী ও তার ভাই মইনুদ্দিন চৌধুরী মাসুকের বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই মাস ধরে দিরাই উপজেলা বিএনপির কার্যক্রম অনেকটা পৃথকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন, যৌথ সভা, নেতাকর্মীদের অব্যাহতির সুপারিশ এবং পৃথক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এ বিরোধের সূত্রপাত।
গত ৬ আগষ্ট নাছির উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে দিরাই উপজেলা ও পৌর বিএনপির উদ্যোগে দিরাই বাজারে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এর দুই দিন পর ৮ আগষ্ট মইনুদ্দিন চৌধুরী মাসুকের নেতৃত্বে পাল্টা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হলেও তা উপেক্ষা করে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় বলে জানা গেছে। এতে মাসুকের অনুসারীদের পাশাপাশি দিরাই শাল্লা আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন প্রাপ্ত ও জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা এডভোকেট তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল ও সাবেক বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী রুমি বলয়ের নেতাকর্মীরাও অংশ নেন।
এর মধ্যে গত ১০ আগষ্ট সংসদ সদস্য নাছির উদ্দীন চৌধুরীর স্ত্রী পারভীন আক্তার আদালতে মইনুদ্দিন চৌধুরী মাসুকসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশের দাবি, পাল্টাপাল্টি সমাবেশের পর দিরাই বিএনপির রাজনীতি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে রয়েছেন সংসদ সদস্য নাছির উদ্দীন চৌধুরী, অন্যদিকে রয়েছেন তাহির চৌধুরী পাবেল ও মইনুদ্দিন চৌধুরী মাসুকের অনুসারীরা। তবে নাছির উদ্দীন চৌধুরীর সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যেও সম্প্রতি একাধিক উপ-গ্রুপ তৈরি হয়েছে।
দলীয় সূত্র বলছে, নাছির উদ্দীন চৌধুরীর পক্ষে দিরাইয়ের সাংগঠনিক কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন জেলা বিএনপির সদস্য আব্দুর রশিদ চৌধুরী, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমির হোসেন ও যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির তালুকদার। এই তিন নেতার বিরুদ্ধে ত্যাগী নেতাকর্মীদের উপেক্ষা, সমন্বয়হীনতা এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার অভিযোগ তুলেছেন দলের একটি অংশ।
এ পরিস্থিতিতে বর্তমান নেতৃত্বের বাইরে সিনিয়র ও ত্যাগী নেতাদের নিয়ে একটি সমন্বয় কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেন সংসদ সদস্য নাছির উদ্দীন চৌধুরী। এ নিয়ে শনিবার ঢাকায় নাছির উদ্দিন চৌধুরীর বাসভবনে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপজেলা বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাদের সম্ভাব্য সমন্বয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
তবে বৈঠকে উপস্থিত নেতাদের কয়েকজন জানান, বর্তমান তিন নেতার অনুসারীরা প্রস্তাবিত কমিটির বিরোধিতা করেন। তাদের অভিযোগ, প্রস্তাবিত কমিটিতে থাকা কয়েকজন নেতা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন কিংবা বিভিন্ন সময়ে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। এ নিয়ে বৈঠকে মতবিরোধ দেখা দিলে শেষ পর্যন্ত নাছির উদ্দীন চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে পরে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে বৈঠক শেষ করেন।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতার দাবি, নাছির চৌধুরীর বলয়ের মধ্যে একাধিক উপ-গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এমপির নাম ব্যবহার করে তিন নেতা ‘সিন্ডিকেট’ করে সংগঠন পরিচালনা করছেন-এমন অভিযোগ তুলে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দ ও সাবেক ছাত্রদল নেতাদের একটি অংশ। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যের স্ত্রী পারভীন আক্তার ও তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) রুদ্র মিজানও তিন নেতার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
মূলত পদ-পদবি, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্পে সুযোগ-সুবিধা পাওয়াকে কেন্দ্র করেই এই বিভক্তি তৈরি হয়েছে বলে দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের দাবি। তাদের মতে, অভ্যন্তরীণ এ বিরোধ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দ্রুত সমাধান না হলে দিরাই বিএনপিতে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এলাকার রাজনৈতিক ও উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকি করার জন্য একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করতে যাচ্ছেন নাছির চৌধুরী। কমিটিতে সদস্য হতে পারেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি রশিদ আহমদ বাচ্চু, কবির মিয়া, নুরুল হক তালুকদার, শামসুল ইসলাম, সেজু মিয়া, পৌর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. জালাল মিয়া, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সাব্বির মিয়া, উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাপ মিয়া, সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মোখলেচুর রহমান লাল মিয়া, উপজেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক সালাহ উদ্দিন তালুকদার, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক সজির রশীদ চৌধুরী, পৌর যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি জিয়াউল ইসলাম এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা আল মরিয়াদ তনয়। দপ্তরের দায়িত্বে থাকবেন পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক সর্দার ও ছাত্রদল নেতা শাহ আলম।
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ 


















