ছাতক-সিলেট বিদ্যুৎ দপ্তরে ১৫ বছরের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির রেকর্ড ফাঁস

ছাতক ও সিলেট বিদ্যুৎ বিতরণ ও বিক্রয় বিভাগে গত ১৫ বছর ধরে চলা ভয়াবহ দুর্নীতি, ঘুষবাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও সরকারি মালামাল আত্মসাতের বিস্তৃত অভিযোগ উঠেছে। এক নাগরিকের দায়ের করা ১৭ পৃষ্ঠার লিখিত অভিযোগে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার ছাতকের সেবুল মিয়া প্রধানমন্ত্রী, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ সচিব, ডিএফআই এবং দুদকের মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগপত্র জমা দেন। অভিযোগের সঙ্গে বিভিন্ন নথিপত্র ও পত্রিকার কাটিং সংযুক্ত করা হয়েছে।

সরকারি মালামাল গায়েবের অভিযোগ

অভিযোগে বলা হয়, ২০১১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া পুরাতন সরকারি তার, ট্রান্সফরমার, খুঁটি, কপার ও অ্যালুমিনিয়ামের কোনো মালামাল সরকারি স্টোরে জমা হয়নি। বরং ছাতক ও সিলেট বিভাগের কিছু প্রকৌশলীর প্রত্যক্ষ মদদে এসব মালামাল গোপনে পাচার করা হয়েছে।

ভাঙারি ব্যবসায়ী শফিকুল ও সিরাজুলের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট ভুয়া ভাউচার তৈরি করে কোটি কোটি টাকার মালামাল পাচার করেছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়। এমনকি একটি নির্দিষ্ট নম্বরের ট্রাকে নিয়মিত নতুন তামার তার ঢাকায় নিয়ে বিক্রির অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে ছাতক প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া ও সিলেটের চিফ প্রকৌশলী আব্দুল কাদেরের নামও উঠে এসেছে।

জাইকা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

২০১১ সালের জাইকা-অর্থায়িত বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্পে উচ্চমানের তামার তার সরিয়ে নিম্নমানের অ্যালুমিনিয়াম তার বসানোর অভিযোগ করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের শর্ত লঙ্ঘিত হয়েছে এবং বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। ফলে এলাকায় বিদ্যুৎ লাইনে ঘনঘন ট্রিপিং ও দুর্বল সরবরাহের অভিযোগ বাড়ে।

‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ প্রকল্পে চাঁদাবাজি

২০১৮ সালের ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ প্রকল্পে সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ছাতক, দোয়ারাবাজার, শান্তিগঞ্জ ও জগন্নাথপুরে ৪০০-এর বেশি গ্রাহকের কাছ থেকে ২৫–৩০ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে। এক বছরের প্রকল্প সাত বছরেও শেষ না হওয়ায় গ্রাহকদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে বলে দাবি অভিযোগকারীর।

চাঁদা দাবিতে অভিযান ও মামলা

দেওকাপন গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগের নামে চাঁদা দাবির ঘটনায় স্থানীয়দের অভিযোগের পর সেনা ক্যাম্পের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে নগদ টাকাসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মামলায় একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সমঝোতার মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে।

বদলি-বাণিজ্য ও রাজনৈতিক ছত্রছায়া

অভিযোগে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে বদলি-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেছে বলেও দাবি করা হয়। এতে সৎ কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং দুর্নীতির নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয়।

গত ২ মার্চ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদেরকে কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্টে বদলি করে। একইদিন ঢাকার উপপরিচালক মোজাম্মেল বদলির আদেশ জারি করেন। এ বদলি ঘিরে ছাতক–সিলেটে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগী গ্রাহক ও স্থানীয়দের দাবি— ২০১১–২০২৬ পর্যন্ত উদ্ধারকৃত সরকারি মালামালের পূর্ণাঙ্গ অডিট, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, প্রকল্পে রাষ্ট্রীয় ক্ষতির অর্থ উদ্ধার, গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায়কৃত টাকা ফেরত এবং বদলি-বাণিজ্য বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ।

ট্যাগ:
জনপ্রিয়

ছাতক-সিলেট বিদ্যুৎ দপ্তরে ১৫ বছরের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির রেকর্ড ফাঁস

প্রকাশের সময়: ০৬:২৯:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

ছাতক ও সিলেট বিদ্যুৎ বিতরণ ও বিক্রয় বিভাগে গত ১৫ বছর ধরে চলা ভয়াবহ দুর্নীতি, ঘুষবাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও সরকারি মালামাল আত্মসাতের বিস্তৃত অভিযোগ উঠেছে। এক নাগরিকের দায়ের করা ১৭ পৃষ্ঠার লিখিত অভিযোগে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার ছাতকের সেবুল মিয়া প্রধানমন্ত্রী, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ সচিব, ডিএফআই এবং দুদকের মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগপত্র জমা দেন। অভিযোগের সঙ্গে বিভিন্ন নথিপত্র ও পত্রিকার কাটিং সংযুক্ত করা হয়েছে।

সরকারি মালামাল গায়েবের অভিযোগ

অভিযোগে বলা হয়, ২০১১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া পুরাতন সরকারি তার, ট্রান্সফরমার, খুঁটি, কপার ও অ্যালুমিনিয়ামের কোনো মালামাল সরকারি স্টোরে জমা হয়নি। বরং ছাতক ও সিলেট বিভাগের কিছু প্রকৌশলীর প্রত্যক্ষ মদদে এসব মালামাল গোপনে পাচার করা হয়েছে।

ভাঙারি ব্যবসায়ী শফিকুল ও সিরাজুলের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট ভুয়া ভাউচার তৈরি করে কোটি কোটি টাকার মালামাল পাচার করেছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়। এমনকি একটি নির্দিষ্ট নম্বরের ট্রাকে নিয়মিত নতুন তামার তার ঢাকায় নিয়ে বিক্রির অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে ছাতক প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া ও সিলেটের চিফ প্রকৌশলী আব্দুল কাদেরের নামও উঠে এসেছে।

জাইকা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

২০১১ সালের জাইকা-অর্থায়িত বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্পে উচ্চমানের তামার তার সরিয়ে নিম্নমানের অ্যালুমিনিয়াম তার বসানোর অভিযোগ করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের শর্ত লঙ্ঘিত হয়েছে এবং বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। ফলে এলাকায় বিদ্যুৎ লাইনে ঘনঘন ট্রিপিং ও দুর্বল সরবরাহের অভিযোগ বাড়ে।

‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ প্রকল্পে চাঁদাবাজি

২০১৮ সালের ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ প্রকল্পে সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ছাতক, দোয়ারাবাজার, শান্তিগঞ্জ ও জগন্নাথপুরে ৪০০-এর বেশি গ্রাহকের কাছ থেকে ২৫–৩০ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে। এক বছরের প্রকল্প সাত বছরেও শেষ না হওয়ায় গ্রাহকদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে বলে দাবি অভিযোগকারীর।

চাঁদা দাবিতে অভিযান ও মামলা

দেওকাপন গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগের নামে চাঁদা দাবির ঘটনায় স্থানীয়দের অভিযোগের পর সেনা ক্যাম্পের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে নগদ টাকাসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মামলায় একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সমঝোতার মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে।

বদলি-বাণিজ্য ও রাজনৈতিক ছত্রছায়া

অভিযোগে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে বদলি-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেছে বলেও দাবি করা হয়। এতে সৎ কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং দুর্নীতির নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয়।

গত ২ মার্চ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদেরকে কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্টে বদলি করে। একইদিন ঢাকার উপপরিচালক মোজাম্মেল বদলির আদেশ জারি করেন। এ বদলি ঘিরে ছাতক–সিলেটে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগী গ্রাহক ও স্থানীয়দের দাবি— ২০১১–২০২৬ পর্যন্ত উদ্ধারকৃত সরকারি মালামালের পূর্ণাঙ্গ অডিট, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, প্রকল্পে রাষ্ট্রীয় ক্ষতির অর্থ উদ্ধার, গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায়কৃত টাকা ফেরত এবং বদলি-বাণিজ্য বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ।