যে চ্যালেঞ্জ নিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে যাচ্ছেন মেসি

বিষয়টা অনেকটাই অবধারিত ছিল। বিশ্বকাপের আগে শেষ উইন্ডোতেও দলের প্রাণভোমরা হয়ে খেলছেন, সেই লিওনেল মেসি ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলবেন না, তা বোধ করি এ পৃথিবীর কোনো ফুটবল দর্শকই বিশ্বাস করতেন না। কোচ লিওনেল স্কালোনির ২৬ জনের স্কোয়াডে সে অবিশ্বাস্য ঘটনাটা ঘটেনি। মেসিকে অধিনায়ক করেই দলটা ঘোষণা করেছেন আর্জেন্টাইন কোচ।

শেষ পর্যন্ত সাসপেন্সটা ছিল, কারণ মেসি নিজেই বলেছিলেন, বিশ্বকাপে খেলাটা নিশ্চিত নয়। ৩৯ ছুঁইছুঁই বয়সে যে কোনো কিছুই হতে পারে। মূলত সে কারণেই আর্জেন্টিনাকে বিকল্প ব্যবস্থা রাখার ইঙ্গিতটা দিয়েছিলেন তিনি। শেষমেশ আলবিসেলেস্তেদের সে প্ল্যান ‘বি’তে যেতে হয়নি, প্ল্যান ‘এ’তে থেকে মেসিকে নিয়েই বিশ্বকাপে পা রাখবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।

ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া মেসির প্রায় সব ট্রফিই জেতা হয়ে গেছে। বিশ্বকাপও জেতা হয়ে গেছে সেই ২০২২ বিশ্বকাপে। তাই আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে এই বিশ্বকাপে অনেকটাই নির্ভার হয়ে খেলতে পারবেন মেসি। কিন্তু বাস্তবে কি আদৌ তা পারবেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা?

উত্তরটা হচ্ছে না। কারণ মেসি যখন খেলছেন, গোটা বিশ্বের স্পটলাইটটা থাকবে তার ওপর, থাকবে পারফর্ম করে যাওয়ার, পুরো আলোটা নিজের ওপরই রাখার চাপটাও। মেসি সেটা গোটা ক্যারিয়ারে বহু বছর ধরেই করে আসছেন। কি বার্সেলোনা, কি আর্জেন্টিনা বা হালের ইন্টার মিয়ামি, যেখানেই গেছেন, পারফর্ম করেছেন সে চাপটা মাথায় নিয়েই।

তবে মেসির সামনে চ্যালেঞ্জ এটাই একমাত্র নয়। ২০০৮ অলিম্পিকসহ আর্জেন্টিনা দলের হয়ে তিনি এ পর্যন্ত তিনি শিরোপা জিতেছেন ৫টি। ২০২৪ কোপা আমেরিকা বাদে তার প্রতিটির ফাইনালেই গোল ছিল আনহেল দি মারিয়ার। সেই দি মারিয়া এবার দলে নেই।

বিষয়টা চোখে পড়া শুরু করে ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল থেকে। কোয়ার্টার ফাইনালে পাওয়া চোট সেমিফাইনালে তাকে খেলতেই দেয়নি। যার ফলে আর্জেন্টিনা অনেকটাই মেসি নির্ভর হয়ে পড়ে। ফাইনালে তার খেলার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষমেশ আর খেলা হয়নি। মেসি-কেন্দ্রিক আর্জেন্টিনাও আর বিশ্বকাপ জিততে পারেনি সেবার।

২০১৫ আর ২০১৬ কোপা আমেরিকায় দি মারিয়া খেলেছেন বটে, কিন্তু আলো ছড়াতে পারেননি দুই ফাইনালের একটিতেও। মেসিও তা পারেননি, আর্জেন্টিনাও জেতেনি তাই। দি মারিয়া আলো ছড়ালেন ২০২১ কোপার ফাইনালে এসে, আর্জেন্টিনার খরা কাটল তার হাত (নাকি পা?) ধরে।

এরপর দি মারিয়া ফিনালিসিমা আর ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালেও গোল করেছেন, আর্জেন্টিনাই হেসেছে শেষ হাসিটা। ‘আর্জেন্টিনাকে কিছু জেতাতে মেসির দি মারিয়ার সাহায্যের প্রয়োজন পড়েই’ বা কান পাতলে আরেকটু অপরিশীলিতভাবে শুনতে পাওয়া ‘দি মারিয়া ছাড়া মেসি অচল’ — সে তত্ত্বগুলোও বড়সড় একটা ভিত্তি পেয়ে যায়।

২০২৪ কোপা আমেরিকায় অবশ্য দুজনের তেমন বড় অবদান ছাড়াই আর্জেন্টিনা জিতেছে, কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে সে তত্ত্বটা এখনও টিকে আছে ভালোভাবেই। ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা কোনো পর্যায়ে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়লেই তত্ত্বটা টিকে যাবে আজীবনের জন্য। মেসির সামনে এবার চ্যালেঞ্জ সে তত্ত্বটাকেও ভুল প্রমাণ করার।

তত্ত্ব, বা ন্যারেটিভকে ভুল প্রমাণ করার ইতিহাস অবশ্য মেসির কম নয়। ‘ইংল্যান্ডে খেললে কিছুই করতে পারতেন না’ তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ইংলিশ দলের বিপক্ষে সর্বোচ্চ গোল করেছেন, ওয়েম্বলিতে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে ট্রফি জিতেছেন, ‘নেতা নন’ এমন আলাপের জবাবে দেখিয়েছেন আর্জেন্টিনা কীভাবে তার পেছনে খেলতে, তার জন্য যুদ্ধে নামতে মুখিয়ে থাকে, এমন আরও শত শত মিথ ভেঙেছেন।

জীবনের শেষ বিশ্বআসরে এবার সবচেয়ে বড় মিথের সামনে দাঁড়িয়ে মেসি। তত্ত্ব, ন্যারেটিভ, মিথ বা চ্যালেঞ্জ সে যাই বলুন, কথাটা আর্জেন্টাইন কারো গিয়ে মেসির কানে বলে দেওয়া উচিত। সেটা হলে আর্জেন্টিনার আরও এক বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কারণ মিথ ভাঙা, তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করা, চ্যালেঞ্জকে জয় করার অভ্যাস এখনকার ফুটবলে মেসির চেয়ে ভালো কারইবা আছে?

ট্যাগ:
জনপ্রিয়

যে চ্যালেঞ্জ নিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে যাচ্ছেন মেসি

প্রকাশের সময়: ১১:২০:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

বিষয়টা অনেকটাই অবধারিত ছিল। বিশ্বকাপের আগে শেষ উইন্ডোতেও দলের প্রাণভোমরা হয়ে খেলছেন, সেই লিওনেল মেসি ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলবেন না, তা বোধ করি এ পৃথিবীর কোনো ফুটবল দর্শকই বিশ্বাস করতেন না। কোচ লিওনেল স্কালোনির ২৬ জনের স্কোয়াডে সে অবিশ্বাস্য ঘটনাটা ঘটেনি। মেসিকে অধিনায়ক করেই দলটা ঘোষণা করেছেন আর্জেন্টাইন কোচ।

শেষ পর্যন্ত সাসপেন্সটা ছিল, কারণ মেসি নিজেই বলেছিলেন, বিশ্বকাপে খেলাটা নিশ্চিত নয়। ৩৯ ছুঁইছুঁই বয়সে যে কোনো কিছুই হতে পারে। মূলত সে কারণেই আর্জেন্টিনাকে বিকল্প ব্যবস্থা রাখার ইঙ্গিতটা দিয়েছিলেন তিনি। শেষমেশ আলবিসেলেস্তেদের সে প্ল্যান ‘বি’তে যেতে হয়নি, প্ল্যান ‘এ’তে থেকে মেসিকে নিয়েই বিশ্বকাপে পা রাখবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।

ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া মেসির প্রায় সব ট্রফিই জেতা হয়ে গেছে। বিশ্বকাপও জেতা হয়ে গেছে সেই ২০২২ বিশ্বকাপে। তাই আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে এই বিশ্বকাপে অনেকটাই নির্ভার হয়ে খেলতে পারবেন মেসি। কিন্তু বাস্তবে কি আদৌ তা পারবেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা?

উত্তরটা হচ্ছে না। কারণ মেসি যখন খেলছেন, গোটা বিশ্বের স্পটলাইটটা থাকবে তার ওপর, থাকবে পারফর্ম করে যাওয়ার, পুরো আলোটা নিজের ওপরই রাখার চাপটাও। মেসি সেটা গোটা ক্যারিয়ারে বহু বছর ধরেই করে আসছেন। কি বার্সেলোনা, কি আর্জেন্টিনা বা হালের ইন্টার মিয়ামি, যেখানেই গেছেন, পারফর্ম করেছেন সে চাপটা মাথায় নিয়েই।

তবে মেসির সামনে চ্যালেঞ্জ এটাই একমাত্র নয়। ২০০৮ অলিম্পিকসহ আর্জেন্টিনা দলের হয়ে তিনি এ পর্যন্ত তিনি শিরোপা জিতেছেন ৫টি। ২০২৪ কোপা আমেরিকা বাদে তার প্রতিটির ফাইনালেই গোল ছিল আনহেল দি মারিয়ার। সেই দি মারিয়া এবার দলে নেই।

বিষয়টা চোখে পড়া শুরু করে ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল থেকে। কোয়ার্টার ফাইনালে পাওয়া চোট সেমিফাইনালে তাকে খেলতেই দেয়নি। যার ফলে আর্জেন্টিনা অনেকটাই মেসি নির্ভর হয়ে পড়ে। ফাইনালে তার খেলার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষমেশ আর খেলা হয়নি। মেসি-কেন্দ্রিক আর্জেন্টিনাও আর বিশ্বকাপ জিততে পারেনি সেবার।

২০১৫ আর ২০১৬ কোপা আমেরিকায় দি মারিয়া খেলেছেন বটে, কিন্তু আলো ছড়াতে পারেননি দুই ফাইনালের একটিতেও। মেসিও তা পারেননি, আর্জেন্টিনাও জেতেনি তাই। দি মারিয়া আলো ছড়ালেন ২০২১ কোপার ফাইনালে এসে, আর্জেন্টিনার খরা কাটল তার হাত (নাকি পা?) ধরে।

এরপর দি মারিয়া ফিনালিসিমা আর ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালেও গোল করেছেন, আর্জেন্টিনাই হেসেছে শেষ হাসিটা। ‘আর্জেন্টিনাকে কিছু জেতাতে মেসির দি মারিয়ার সাহায্যের প্রয়োজন পড়েই’ বা কান পাতলে আরেকটু অপরিশীলিতভাবে শুনতে পাওয়া ‘দি মারিয়া ছাড়া মেসি অচল’ — সে তত্ত্বগুলোও বড়সড় একটা ভিত্তি পেয়ে যায়।

২০২৪ কোপা আমেরিকায় অবশ্য দুজনের তেমন বড় অবদান ছাড়াই আর্জেন্টিনা জিতেছে, কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে সে তত্ত্বটা এখনও টিকে আছে ভালোভাবেই। ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা কোনো পর্যায়ে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়লেই তত্ত্বটা টিকে যাবে আজীবনের জন্য। মেসির সামনে এবার চ্যালেঞ্জ সে তত্ত্বটাকেও ভুল প্রমাণ করার।

তত্ত্ব, বা ন্যারেটিভকে ভুল প্রমাণ করার ইতিহাস অবশ্য মেসির কম নয়। ‘ইংল্যান্ডে খেললে কিছুই করতে পারতেন না’ তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ইংলিশ দলের বিপক্ষে সর্বোচ্চ গোল করেছেন, ওয়েম্বলিতে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে ট্রফি জিতেছেন, ‘নেতা নন’ এমন আলাপের জবাবে দেখিয়েছেন আর্জেন্টিনা কীভাবে তার পেছনে খেলতে, তার জন্য যুদ্ধে নামতে মুখিয়ে থাকে, এমন আরও শত শত মিথ ভেঙেছেন।

জীবনের শেষ বিশ্বআসরে এবার সবচেয়ে বড় মিথের সামনে দাঁড়িয়ে মেসি। তত্ত্ব, ন্যারেটিভ, মিথ বা চ্যালেঞ্জ সে যাই বলুন, কথাটা আর্জেন্টাইন কারো গিয়ে মেসির কানে বলে দেওয়া উচিত। সেটা হলে আর্জেন্টিনার আরও এক বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কারণ মিথ ভাঙা, তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করা, চ্যালেঞ্জকে জয় করার অভ্যাস এখনকার ফুটবলে মেসির চেয়ে ভালো কারইবা আছে?