ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উন্নত জীবনের আশায় পড়তে আসছেন বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি। আর পড়তে এসে পড়াশোনা ও ব্যয়বহুল জীবন যাপনের খরচ মেটানো দুর্বিষহ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জন্য।
অনেকে খণ্ডকালীন চাকরির ব্যবস্থা করতে না পেরে বিভিন্ন গ্রুপে খাবারের জন্য সাহায্যের জন্য আবেদনও করছেন।
ফিনল্যান্ডে পড়তে এসেছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ছোঁয়া (ছদ্মনাম)।
তিনি ঢাকার বেসরকারি একটি ব্যাংকে চাকরি করতেন। পড়াশোনা করেছেন দেশের নামকরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
স্বামী ও সন্তান নিয়ে উন্নত জীবনের আশায় বিপুল অংকের টাকা খরচ করে এসেছেন তারা। কিন্তু ফিনল্যান্ডে আসার আট মাসেও তারা কোনো খণ্ডকালীন চাকরির ব্যবস্থা করতে পারেননি।
সরকারি কিছু ভাতা ও জমানো টাকা দিয়েই তাদের সংসার চালাতে হচ্ছে।
আলাপকালে এ দম্পতি জানান, সন্তানের উন্নত ভবিষ্যৎ ও নিজেদের নিরাপদ জীবনের জন্যই তাদের ফিনল্যান্ডে আসা। কিন্তু এ স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। খণ্ডকালীন চাকরি নেই। ফিনিশ ভাষা ফ্রিতে শেখার ব্যবস্থা থাকলেও এ ভাষা অনেক কঠিন। ভাষা ছাড়া চাকরিও পাওয়া যাচ্ছে না। জমানো টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় কি করবো বুঝতে পারছি না। অনেকে বলছেন, স্পেনে চলে যেতে, আবার কেউ বলছেন, জার্মানিতে আগামী সেপ্টেম্বর সেশনে মাস্টার্সে ভর্তি হতে। কিন্তু সেখানেও বিপুল টাকা ব্লক একাউন্টে দেখাতে হবে।
বাংলাদেশি এ দম্পতি আরও জানান, সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া কারোরই বিদেশে আসা উচিত না। আর পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না থাকলে বৃত্তি ছাড়াও ইউরোপে আসা উচিত না। কেননা, এখানে এসে খণ্ডকালীন চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করা খুবই কঠিন।
এছাড়া সম্প্রতি ফিনল্যান্ডে পড়তে আসা এক শিক্ষার্থীর শুধুমাত্র খাবার চেয়ে ফেসবুক পোস্টও ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে ইউরোপের কমিউনিটিতে।
একই অবস্থা চোখে পড়ছে ডেনমার্কে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গ্রুপগুলোতে। সেখানে প্রতিনিয়ত সাহায্য ও চাকরির জন্য হাহাকার দেখা যাচ্ছে। অনেকে পড়াশোনার জন্য দরকারি ল্যাপটপের জন্যও সাহায্যের আবেদন করছেন। যা নিয়ে বিব্রত ডেনমার্কে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের একাংশ।
এ বিষয়ে ডেনমার্কের কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব রাকিবুল ইসলাম বলেন, ডেনমার্কে পড়তে আসে অনেকে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ জীবনের জন্য। কিন্তু এখন বড় শহর ছাড়া ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হলে চাকরি পাওয়া কঠিন। বিভিন্ন এজেন্সির প্রলোভনে পড়ে ভালোভাবে রিসার্স না করেও অনেকে চলে আসেন। সবার আর্থিক অবস্থা সমান না হওয়ায় অনেকে ধারদেনা করেও আসেন। কিন্তু এখানে এসে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জে পড়েন। বিভিন্ন গ্রুপে প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীরা চাকরি ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সাহায্যের জন্য আবেদন করছেন। অনেকে ব্যক্তিগতভাবেও যোগাযোগ করছেন। আমাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো সবাইকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি।
তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয়, পার্টটাইম চাকরি করে টিউশন ফি জোগাড় করা এখন আর ডেনমার্কে সম্ভব না। তাই অর্থনৈতিক ব্যাকআপ ছাড়া শুধুমাত্র ডেনমার্কে গেলেই সব হয়ে যাবে, এ চিন্তা নিয়ে ডেনমার্কে পড়তে আসা উচিত নয়। সবারই ভালোভাবে খোঁজ খবর নিয়ে তারপর বিদেশে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
ডেনমার্কে বাংলাদেশের চার্জ ডি’অ্যাফেয়ার্স তন্ময় মজুমদার জানান, বাংলাদেশ থেকে ডেনমার্কে যারা পড়তে আসবেন, তাদের অবশ্যই ডেনমার্কে যারা আগে থেকে থাকছেন বা সমৃদ্ধ ক্যারিয়ার গড়েছেন, তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে আসা উচিত। ডেনমার্কে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ডেনমার্ক দূতাবাস সব সময় ওপেন। আমরা সম্প্রতি একটি ক্যারিয়ার সামিট করেছি। শিক্ষার্থীরা যদি ক্যারিয়ার সামিটগুলোতে এটেন্ড করেন, তাহলে তারা ডেনমার্কের জব মার্কেট সম্পর্কে ধারণা পাবেন। আমরা বাংলাদেশি দূতাবাস জব জেনারেট করতে পারবো না, কিন্তু শিক্ষার্থীরা যাতে সহজে ডেনমার্কে সফল হতে পারেন, সেজন্য সব ধরনের সহযোগিতা করতে পারবো।
তন্ময় মজুমদার নতুনদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, যারা ডেনমার্কে পড়তে এসেছেন বা আসবেন তারা যেনো অবশ্যই সিনিয়রদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে বা বিভিন্ন গ্রুপে পরামর্শ করে আসেন।
একই অবস্থা জার্মানিতেও। জার্মানির বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গ্রুপেও বাংলাদেশি অনেক শিক্ষার্থী চাকরি ও সহযোগিতা চেয়ে নানা পোস্ট করছেন। দীর্ঘদিন চাকরি না পেয়ে একাধিক শিক্ষার্থীর খারাপ অবস্থা তুলে ধরা এ পোস্টগুলো দেখে অনেকে সহযোগিতাও করছেন। অনেকে চাকরি ম্যানেজ করে দেওয়ারও আশ্বাস দিচ্ছেন।
জার্মানিতে মাস্টার্স করতে আসা শিক্ষার্থী রবি (ছদ্মনাম) দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি শিল্পগ্রুপে উত্তরবঙ্গে চাকরি করতেন। বেতনও ছিল বেশ ভালো। কিন্তু উন্নত জীবনের আশায় ৩০ পেরোনোর পরে আসেন জার্মানিতে। কিন্তু বিধি বাম। শুরুতে কিছুদিন খণ্ডকালীন চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারলেও এখন পারছেন না। কারন, চাকরি নেই তার। বেসরকারি হেলথ ইন্স্যুরেন্স থাকায় শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার জন্যও তাকে পোহাতে হচ্ছে নানান ভোগান্তি।
রবি জানান, পার্টটাইম চাকরি ছাড়া পরবর্তী বছরের ভিসাও রিনিউ হয় না জার্মানিতে। ব্লক একাউন্ট করার টাকাও নেই তার। এখন তার এমন অবস্থা যে জার্মানিতে কারও কাছে সাহায্য চাইতে পারছেন না, আবার সম্মানের ভয়ে দেশেও কারো কাছে বলতে পারছেন না।
বাংলাদেশ দূতাবাস জার্মানির সূত্র জানিয়েছে, জার্মানিতে বাংলাদেশ থেকে পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা যাতে ভালো থাকেন, সেজন্য তারা শিগগিরিই ক্যারিয়ার সামিটের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেখানে জার্মানির কোন কোন সেক্টরে চাকরির বাজার ভালো, কোথায় সহজে আউসবিল্ডুং (জার্মানির একটি দ্বৈত ভোকেশনাল ট্রেনিং বা ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম) পাওয়া যাবে কিংবা সহজে ব্যবসা করা যাবে তা তুলে ধরা হবে। এসব বিষয় নিয়ে জার্মানিতে থাকা সফল বাংলাদেশিদের সঙ্গে দূতাবাস কর্মকর্তারা আলোচনা শুরু করেছেন। এতে করে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা জার্মানিতে আসার আগেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং এখানে এসে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হবে না।
এ বিষয়ে ‘জার্মান প্রবাসী’ সম্পাদক জাহিদ কবির হিমন বলেন, জার্মানিতে যারা উচ্চশিক্ষার জন্য আসছেন বা ভবিষ্যতে আসবেন, তারা যদি সুস্পষ্ট ক্যারিয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আসেন এবং জার্মান ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন, তাহলে চাকরি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার তেমন কোনো কারণ থাকবে না। আমার বিশ্বাস, সঠিক প্রস্তুতি থাকলে অধিকাংশ সমস্যাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
জার্মানির এ কমিউনিটি সংগঠক আরও জানান, জার্মানিতে আসার পর বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে নতুনরা সঠিক দিকনির্দেশনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরামর্শ পাওয়া যায়। কারণ, একজন বাংলাদেশির অভিজ্ঞতা ও সহমর্মিতা আরেকজন বাংলাদেশির পথচলাকে যে ধরনের সহযোগিতা দিতে পারে, তা অনেক সময় অন্যদের পক্ষে সম্ভব হয় না।
কালনী ভিউ ডেস্কঃ 


















