৯৬ বছর আগে উরুগুয়েতে শুরু হয়েছিল ফিফা বিশ্বকাপের পথচলা। এরপর সময় বদলেছে, দল বদলেছে, ফুটবলের ধরনও পাল্টেছে।
কিন্তু বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ থেকে গেছে গোল। এই গোলই লিখেছে অসংখ্য গল্প, তৈরি করেছে কিংবদন্তি।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে যারা বারবার জাল খুঁজে নিয়েছেন, তারাই জায়গা করে নিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় সবার ওপরে আছেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসে।
তবে তার পেছনে আছেন রোনালদো নাজারিও, গার্ড মুলার, লিওনেল মেসি, জুস্ত ফন্তেইন, পেলে ও কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো কিংবদন্তি ও সময়ের সেরা তারকারা।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে ১২ গোল নিয়ে পঞ্চম স্থানে যৌথভাবে আছেন পেলে ও কিলিয়ান এমবাপ্পে।
দুজনের গোলসংখ্যা সমান হলেও পথচলা একেবারেই ভিন্ন।
চারটি বিশ্বকাপে ১২ গোল করেছিলেন পেলে। এর মধ্যে তিনটি গোল এসেছে ফাইনালে। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে সুইডেনের বিপক্ষে ফাইনালে কিশোর পেলের জোড়া গোল ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল। এরপর ১৯৭০ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর এস্তাদিও আজতেকায় ইতালির বিপক্ষে ফাইনালেও গোল করেন তিনি। সেই আসরেই নিজের প্রজন্মের সেরা ফুটবলার হিসেবে জায়গা পোক্ত করেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি।
অন্যদিকে এমবাপ্পে মাত্র দুই বিশ্বকাপেই ছুঁয়েছেন পেলের ১২ গোলের মাইলফলক। এর মধ্যে চারটি গোলই করেছেন ফাইনালে। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ফাইনালে গোল করেছিলেন ফরাসি তারকা। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে করেন ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপ ফাইনালে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডও এখন তার দখলে। বয়স ও সামর্থ্য বিবেচনায় তালিকায় আরও ওপরে ওঠার বড় দাবিদার এমবাপ্পে।
১৩ গোল নিয়ে চতুর্থ স্থানে যৌথভাবে আছেন ফ্রান্সের জুস্ত ফন্তেইন ও আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি। ফন্তেইনের রেকর্ড বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায়গুলোর একটি। ১৯৫৮ সুইডেন বিশ্বকাপে মাত্র ছয় ম্যাচে ১৩ গোল করেছিলেন তিনি।
প্যারাগুয়ের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক দিয়ে শুরু করেছিলেন ফন্তেইন। এরপর যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে এক গোল, কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে আরও দুই গোল এবং সেমিফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে গোল করেন তিনি। এখানেই থামেননি। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে করেন চার গোল। এক আসরে ১৩ গোলের সেই রেকর্ড ছয় দশকের বেশি সময় পরও কেউ ভাঙতে পারেনি। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সেটিই ছিল তার ক্যারিয়ারের একমাত্র বিশ্বকাপ।
ফন্তেইনের পাশে আছেন মেসি। নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন আর্জেন্টাইন তারকা। আগের পাঁচ বিশ্বকাপে ১৩ গোল করেছেন তিনি। শুধু ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে গোল পাননি মেসি। ২০০৬ বিশ্বকাপে একটি, ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে চারটি, ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে একটি এবং বাকি গোলগুলো করেছেন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে তার জোড়া গোল ছিল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি। বিশ্বকাপ ট্রফি জিতে ক্যারিয়ার পূর্ণ করা মেসির সামনে এখন সর্বকালের গোলদাতাদের তালিকায় আরও ওপরে ওঠার সুযোগ।
১৪ গোল নিয়ে তৃতীয় স্থানে আছেন জার্মানির গার্ড মুলার। ‘দ্য বোম্বার’ নামে পরিচিত এই স্ট্রাইকার মাত্র দুই বিশ্বকাপে গড়েন এমন কীর্তি। তার গোল করার দক্ষতা তাকে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ফরোয়ার্ডদের একজন বানিয়েছে।
১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপে ১০ গোল করে আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন মুলার। সেই আসরে ইতালির বিপক্ষে বিখ্যাত সেমিফাইনাল, যা ‘গেম অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে পরিচিত, সেখানে জোড়া গোল করেছিলেন তিনি। চার বছর পর ১৯৭৪ বিশ্বকাপে গোলসংখ্যা কম হলেও গুরুত্ব ছিল আরও বেশি। অস্ট্রেলিয়া, যুগোস্লাভিয়া ও পোল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করার পর ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে করেন ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোল। তার গোলেই ঘরের মাঠে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় পশ্চিম জার্মানি।
১৫ গোল নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও। মিরোস্লাভ ক্লোসে শীর্ষে ওঠার আগে বিশ্বকাপের গোলরাজা ছিলেন ‘ফেনোমেনোন’।
চারটি বিশ্বকাপে অংশ নিলেও ১৯৯৪ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে এক মিনিটও খেলেননি রোনালদো। তার গোলের গল্প শুরু ১৯৯৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপ থেকে। সেই আসরে চার গোল করে ব্রাজিলকে ফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সেমিফাইনালেও গুরুত্বপূর্ণ গোল ছিল তার।
তবে রোনালদোর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের সেরা অধ্যায় ২০০২ কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপ। ভয়াবহ চোট কাটিয়ে ফিরে সেই আসরে ৮ গোল করেন তিনি। ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে জোড়া গোল করে ব্রাজিলকে এনে দেন পঞ্চম বিশ্বকাপ শিরোপা। ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপে আরও তিন গোল যোগ করে ১৫ গোলে পৌঁছান রোনালদো। তখন মনে হচ্ছিল, এই রেকর্ড ভাঙা প্রায় অসম্ভব।
কিন্তু ফুটবল নতুন কিংবদন্তি খুঁজে নেয়। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন মিরোস্লাভ ক্লোসে। জার্মান এই স্ট্রাইকারের গোল ১৬টি। ২০০২ কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে পাঁচ গোল দিয়ে শুরু। ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপেও করেন পাঁচ গোল। ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে আরও চার গোল করে রোনালদোর রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছে যান তিনি।
ঐতিহাসিক মুহূর্তটি আসে ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে। প্রথমে ঘানার বিপক্ষে গোল করে রোনালদোর ১৫ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন ক্লোসে। এরপর ব্রাজিলের মাটিতেই, ব্রাজিলের বিপক্ষেই গড়েন নতুন ইতিহাস।
বেলো হরিজন্তেতে সেমিফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে জার্মানির ৭-১ গোলের সেই অবিশ্বাস্য ম্যাচে ২৩তম মিনিটে গোল করেন ক্লোসে। বক্সের ভেতর ফিরতি বলে লক্ষ্যভেদ করে জার্মানিকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি। সেটিই ছিল তার ১৬তম বিশ্বকাপ গোল। সেই গোলেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যান ক্লোসে।
ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক রাতগুলোর একটিতে অমরত্ব পান জার্মান স্ট্রাইকার। কয়েক দিন পর আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে খেলেন তিনি, জার্মানি হয় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। বিশ্বকাপজয়ী ও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা; দুই পরিচয় নিয়েই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করেন ক্লোসে।
কালনী ভিউ ডেস্কঃ 








